মনে রেখেছি বেগম রোকেয়াকে,ভুলে গেছি তার সহযোদ্ধা মাগুরার সাহিত্যিক ডাক্তার লুৎফর রহমানকে

প্রকাশিত: ৭:৫৬ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৯, ২০২০

বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সহযোদ্ধা ডাক্তার লুৎফর রহমান ছিলেন বাংলার সাহিত্য আকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।মাগুরা জেলার এই ক্ষণজন্মা সাহিত্যিক তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বৃহত্তর যশোর জেলার মাগুরা মহকুমা বর্তমান মাগুরা জেলার পারনান্দুয়ালী গ্রামে ১৮৮৯ সালে জন্ম গ্রহণ করেন।তাঁর পিতা সরদার মঈনউদ্দীন পেশায় ছিলেন একজন স্টেশন মাস্টার ও মাতা সামসুন্নাহার ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ গৃহিণী।পৈত্রিক নিবাস ছিলো মাগুরা জেলার হাজিপুর গ্রামে।তাঁর এফ.এ পাস পিতার ছিল ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ। একারণেই হয়তো ডাক্তার লুৎফর রহমান ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি ঝুকে পড়েন।তিনি সব সময় নারী শিক্ষা বিস্তারের জন্য দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন।কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের নারীদেরকে চার দেয়ালের ভিতর থেকে বের করে আনেন।স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন।একটা সময় পথভ্রষ্ট ও সমাজ পরিত্যক্ত নারীদের নিয়ে তিনি “নারীতীর্থ “নামের একটি সেবা প্রতিষ্ঠান গঠন করেন।বেগম রোকেয়া ছিলেন নারীতীর্থ প্রতিষ্ঠানের সভানেত্রী এবং নিজে ছিলেন সম্পাদক।এ সময়ে “নারীশক্তি” নামের একটি পত্রিকাও তিনি প্রকাশ করেন।ক্রমান্বয়ে তিনি চিন্তাশীল ও যুক্তিবাদী প্রাবন্ধিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন।তাঁর কবিতা,উপ্যাস ও শিশু সাহিত্যের মধ্যে গভীর জীবনবোধ,মানবিক মূল্যবোধ, উচ্চ জীবন,সত্য জীবন ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হয়।ডাক্তার লুৎফর রহমানের সাহিত্য সাধনা শুরু হয়েছিল মূলত কবিতা দিয়ে।তাঁর প্রথম এবং একমাত্র কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯১৫ সালে,উপন্যাস সরলা(১৯১৮),পথহারা, রায়হান(১৯১৯)।ব্যতিক্রমী উপন্যাস প্রীতি উপহার প্রকাশ পায় ১৯২৭ সালে।এছাড়াও তিনি অসংখ্য লেখা লেখেন। অসহযোগ আন্দোলনের শুরু থেকে তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন।মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক সম্পাদিত ত্রৈমাসিক বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ ভার তিনি গ্রহণ করেন।তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত পত্রিকা ও সাময়িকী গুলোতে একে একে প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর রচনাসমূহ। বিশেষ করে সওগাত,হিতবাদী,মোসলেম ভারত,সাধনা,সোলতান,সহচর,সাহিত্য,মোয়াজ্জিন,সাম্যবাদী,মাসিক মোহাম্মদী প্রভৃতি। মুক্তমনা এই সাহিত্যেক লোক দেখানো এবং বংশগত সম্মানকে প্রচন্ডভরে ঘৃণা করতেন।তাই তিনি বংশ উপাধি জোয়ার্দার নামের সাথে ব্যবহার করতেন না।১৯১৬ সালে সিরাজগন্জের ভিক্টোরিয়া হাইস্কুলে অ্যাংলো-পারসিয়ান শিক্ষক পদে শিক্ষকতা শুরু করেন।পরবর্তীতে কলকাতায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শুরু করেন।শেষ জীবনে অর্থকষ্টে পৈত্রিক ভিটা মাগুরার হাজিপুর গ্রামে ফিরে আসেন।প্রচন্ড অর্থকষ্টে ভুগতে থাকা যক্ষারোগে আক্রান্ত হয়ে বিখ্যাত এই মানবতাবাদী সাহিত্যিক ডাক্তার লুৎফর রহমান ১৯৩৬ সালের ৩১শে মার্চ মাত্র ৪৭ বছর বয়সে বিনা চিকিৎসায় নীজ গ্রাম মাগুরার হাজিপুরে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।আল্লাহর অশেষ রহমতে তাঁর অক্রান্ত পরিশ্রমে মাগুরা জেলার মধ্যে নীজ গ্রাম হাজিপুরকে একটি সুশিক্ষিত ও আদর্শ গ্রামে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলে।যা এখনো বিদ্যমান।বেগম রোকেয়ার ন্যায় তিনিও নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখলেও তাকে মাগুরাবাসী কিংবা বাংলাদেশের জন্যগণ ভুলে গেছে।তাঁর জন্মদিবস অথবা মৃত্যুদিবস পালন করা হয় না।তাঁর সাহিত্য কর্ম নিয়েও কোন সভা সেমিনার হয় না।যা জাতির জন্য খুবই দুঃখজনক।
সজীবুজ্জামান
শিক্ষক,কবি,লেখক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট
শ্রীপুর,মাগুরা।