সমাজ জীবনে দুর্গোৎসবের প্রভাব

প্রকাশিত: ৬:৫১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৬, ২০২০

গিরিরাজ হিমালয় ও মেনকার কন্যা এবং শিবের পত্নী দেবী দুর্গা। হিন্দু ধর্মালম্বীদের পরম আরাধ্য ও শ্রদ্ধার দেবতা। সাধারণত দশভূজা মুর্তিতে দুর্গা দেবীর পূজা হয়ে থাকে। পুরাণে বর্ণিত আছে, মহিষাসুর বধকালে তিনি এ মুর্তি ধারণ করেছিলেন। দৈত্যভয়ে ভীত দেবগণকে রক্ষা করার জন্যে দেবী মহাশক্তিরূপে আর্বিভুতা হয়েছিলেন বলে দুর্গাপূজা মুলত শক্তি পূজা। কালক্রমে দুর্গাপূজা আজ শুধু শক্তিপূজা নয়, ইহা দেশ মাতৃকার পূজাও বটে। বসন্তকালই দুর্গাপূজার প্রকৃত সময়। অতি প্রাচীনকালে মহারাজ সুরথ বসন্তকালে দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। বসন্তকালে এ পূজা হত বলে তাকে বলা হত বাসন্তী পূজা। প্রবাদ আছে, শ্রীরামচন্দ্র রাবণকে বধ করার জন্যে শরৎকালে দেবীর অকালে বোধণ করে “শারদীয় পূজা” প্রবর্তন করেন। মহাশক্তিরূপিনী দেবী দূর্গার বরে তিনি লঙ্কা যুদ্ধে জয়লাভ করেন এবং রাবণ বধ করে সীতাকে উদ্ধার করেন। তাঁর প্রদর্শিত রীতি অনুসরন করে বর্তমানে শরৎকালেই দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শরতের বিদায় লগ্নে শিউলি ঝরা প্রভাতে সুবর্ণ ছড়িয়ে দিয়ে দুর্গত মানব হৃদয়ের দুর্গতি নাশ বরে বিশ্বশান্তির পসরা নিয়ে আসে দেবীদুর্গা। বাঙ্গালী হিন্দুদের মনে সম্প্রসারিত হয় অফুরন্ত আনন্দের ঢেউ। এ আনন্দের প্রেরণায় বাংলার গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-নগরে হিন্দু বাঙ্গালী দুর্গোৎসবে মেতে ওঠে। শুধু আনন্দ উপভোগের জন্যেই এ পুজার আবির্ভাব হয়নি। এর পেছনে রয়েছে আরো অনেক কারণ। বৈদেশিক শক্তির শাসন ও শোষণের আমলে বাঙ্গালী হিন্দু যখন হীনবল ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন জাতীয় জীবনে উৎসাহ প্রেরণা ও শক্তি সঞ্চারের জন্যে মহিষমর্দানি দুর্গাদেবীর আরাধণা আরম্ভ করেন। তখন হতেই দুর্গাপূজা সামাজিক উৎসবে রূপ লাভ করে। সমাজ একটা প্রতিষ্ঠান। উৎসব এর বন্ধন সেতু। তাই সমাজে উৎসবের প্রয়োজন রয়েছে। জীবনের একঘেয়েমিকে পরিহার করে সাংসারিক ও পেশাজীবী মানুষের অবকাশ নিয়ে আসে এ সামাজিক উৎসব। তাই এ উৎসব এক বিপুল আনন্দ ধারা। অন্যান্য সামাজিক উৎসবের ন্যায় দুর্গোৎসব ও একটা সামাজিক উৎসব। দুর্গোৎসবে গোটা বাঙ্গালী হিন্দু সমাজের মানুষ নতুন প্রাণ পায়। পূজার কিছুদিন পূর্ব হতে প্রবাসী বাঙ্গালীরা আত্মীয় ও প্রিয়জন দর্শনের আশায় অপেক্ষায় থাকে। এসময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারী অন্যান্য অফিস আদালত ও ছুটি থাকে। ধনী-নির্ধণ সকলেই পূজার আনন্দে যোগ দেয়। দুর্গোৎসবে সামাজিক ও ধর্মীয় মিলন নিছক দেখা সাক্ষাৎ ও শুভেচ্ছা বিনিময় নয়। এ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মানুষের মনের সংকীর্ণতা দূর হয়, পারস্পরিক ভুল বোঝা-বুঝির অবসান হয়। দুর্গোৎসবের কল্যান হাত সবকিছু অকাতরে মুছে নেয়। তাই শারদীয় দুর্গোৎসবে সমাজ ও সামাজিক জীবনে, মানুষ তার আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে আবেগে উচ্ছলতায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। এবার এক ভিন্ন প্রকৃতি ও পরিস্থিতিতে দশভূজা মায়ের আবির্ভাব ঘটেছে। পৃথিবীতে এখন চলছে ঋতুর বৈরীতা। কার্তিকের আকাশে যখন থাকার কথা গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা মেঘের ভেলা, নদীর ধারে বাতাসে যখন দোল খাবার কথা কাশবনের কিন্তু কার্তিক আজ বড়ই মলিন। যেন একডালা বেদনা বুকে নিয়ে শ্রাবনের অবিরত বর্ষণের ভূমিকায় সে অবতীর্ণ হয়েছে। পৃথিবীর সর্বত্র আজ বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের আতঙ্কে আতঙ্কিত। মানুষের মানবতা আজ ধুলায় লুন্ঠিত, সামাজিক উৎসব সমূলে উৎপাটিত। দূর্গাপূজা শক্তি পূজা। এ পূজার মাধ্যমে আমাদের প্রত্যাশা বৈশ্বিক মহামারি কাটিয়ে বিশ্ব বিবেক জাগ্রত হোক, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নানা সমস্যায় জর্জরিত মানবতা মুক্তি পাক, করোনামুক্ত হয়ে শান্তি ও স্বস্তিরসন্ধান লাভ করুক বিশ্ব মানবতা।
লেখক
প্রদীপ কুমার সাহা
সিনিয়র শিক্ষক
শ্রীনগর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজ
যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটি।