সকল বেসরকারি শিক্ষক সংগঠন এক মঞ্চে বসুন

প্রকাশিত: ৯:১৩ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২১, ২০২০

 

স্ব-স্বার্থ, আত্ম-অংহকার, আত্ম-কলহ, আন্ত:গ্রুপিং এবং সংগঠনে নিজের কর্তৃত্ব জাহির করা শুধু সম্মান ও মর্যাদাই হানি করে না বরং স্ব-জাতিকে খোঁড়া করে দেয়৷ দেশের সকল পেশাজীবীদের নিজস্ব সংগঠন আছে এবং নিজ কল্যাণ ও মর্যাদা রক্ষায় সময়ে সময়ে আন্দোলন করে থাকে৷ বেসরকারি শিক্ষক সংগঠন একটু ভিন্ন৷ এখানে পেশাজীবীরা যেমন সংখ্যায় বেশি তেমনি সংগঠনের সংখ্যাও বেশি৷ জবাবদিহীতা ও নির্বাচনমুলক সম্মেলনের মাধ্যমে সংগঠনের কেন্দ্রীয়সহ শাখা-প্রশাখার নেতা নির্বাচনের ব্যবস্থা জোরদার হলে সংগঠনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেত না৷ তবে সংগঠনের সংখ্যা বেশি হলেও আমরা বেশি বলতে পারি না৷ কারণ কিছু সংগঠনের নেতা অবসরপ্রাপ্ত অথবা অতিরিক্ত মেয়াদে খন্ডকালীন শিক্ষক৷ তাদের ডাকে যারা সাড়া দেন, তারা অবুঝ এবং আবেগ পরায়ণ হয়ে গিয়ে থাকেন৷ মনে রাখতে হবে যার ব্যথা সেই বুঝে ব্যথার মর্ম। যাদের ব্যথা নেই তারা শুধুই উপদেশ দিবে৷ অবসরপ্রাপ্ত নেতাদের দ্বারা কখনোই দাবী আদায় হবে না বরং তারা ক্যামেরার সামনে বসার জন্য, নিজ কর্তৃত্ব বজায় রাখতে, স্ব-স্বার্থে নিজেই নিজকে নেতার পরিচয় দিয়ে মিডিয়া ভিত্তিক মায়াকান্নার ন্যায় বক্তব্য দিয়ে আসছেন৷ তাই তাঁদের সাথে কোনো শিক্ষক যাওয়া মানে অরন্যে রোদন৷ আবার কোনো কোনো শিক্ষক নেতা কাংখিত পদ পদবি না পেয়ে কিছু দিন পরপর স্ব-ঘোষিত সংগঠন তৈরি করে পছন্দমত পদটি বেছে নেন৷ এটি শুধু কল্পনা ভিত্তিক আখাংকার কারণেই হয়ে থাকে৷ নৈতিক দিক থেকে কেউ পদ পদবির জন্য সংগঠন ত্যাগ করেন না বরং পদের লোকদের সহায়তা করে থাকেন৷ গত ১৭ মে, ২০১৯ তারিখে এক বক্তব্য স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বললেন যে, তিনি ছাত্র রাজনীতি করেছেন কিন্তু কখনো পদ নিয়ে চিন্তা করেন নি৷ এখন তিনি শুধু বাংলাদেশেরই দীর্ঘতম সফল রাষ্ট্র নায়ক নন বিশ্বের একজন অন্যতম ক্ষমতাবান ব্যক্তি, নেতা ও বিশ্ব চিন্তাবিদ৷ এটি শুধু তাঁর নেতৃত্বের প্রতি সম্মান ও নেতৃত্বে নৈতিক গুণাবলীর কারণেই এসেছেন৷ আর আমাদের শিক্ষকেরা ফেইসবুকে দুই-চার লাইন লেখতে পারলেই নিজকে নেতা হিসেবে নিজেই ঘোষণা দেন৷ আমরা শিক্ষক, আমরা শিখাই; কিন্তু আমাদের মধ্যেও নেতৃত্বের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তা হচ্ছে নিজস্ব স্বার্থে আন্দোলন-সংগ্রাম ও নেতৃত্বের ঘাটতি৷ মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে রয়েছে লক্ষ লক্ষ সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী ব্যক্তি বর্গ৷ তবে কেন এখানে একতার অভাব? আমাদের পেশা, আমাদের সংগঠন, আমাদের আন্দোলন নিয়ে এত প্রশ্নবিদ্ধ কেন? ইতিহাস মানুষকে সংশোধন হতে শিখায়, অনুপ্রেরণা দেয়৷ একটু লক্ষ্য করুন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা আমাদের মতই শিক্ষক৷ কিন্তু তাদের নেই এত দল৷ তারা চায়ের দোকানে বসে, ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বা দুই লাইন বক্তব্য দিয়ে বেশিকদের মত দল ঘোষনা করে না৷ একতার কারণে ২৬ হাজার ১০০ বিদ্যালয় জাতীয়করণ পেয়েছেন এবং তাঁদেরবেতন স্কেলও পরিবর্তন হয়েছে৷ বর্তমানে তারা সবাই সরকারি তবুও তাদের যে কোনো দাবীর ব্যাপারে সরকার পজিটিভ৷ তাদের দাবীর ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী মহোদয় প্রায় প্রোগ্রামের বক্তব্যেই আশ্বাস দিয়ে থাকেন এবং বাস্তবায়নও হচ্ছে৷ কিন্তু আমাদের দাবী আদায় দূরের কথা বেতন থেকে কর্তন রোধে একটি চ্যানেলে খবর প্রচার হওয়ার মত পরিস্থিতি আমরা সৃষ্টি করতে পারি নাই৷ সংখ্যায় আমরা বেশি হওয়াও গ্রুপিংয়ের কারণে আমরা আজ ব্যর্থ৷ আর একটু লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, অতিরিক্ত ৪% কর্তনের ব্যাপারে যারা সম্মতি দিয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে তারা বর্তমানে শিক্ষক কিনা? অবসর প্রাপ্ত/এমপিও বিহীন শিক্ষক সম্মতি দিয়ে থাকলেও টাকা কি তাদের বেতন থেকে কর্তন হচ্ছে? মোটেও না। কিন্তু সরকার জানে তারা আমাদের নেতা৷ তাই আমাদের উচিত হবে সরকারের কাছে সংগঠনের নাম উল্লেখ পূর্বক লিখিতভাবে জানানো যে, তারা এখন শিক্ষক নন এবং আমাদের নেতাও নন এবং আমাদের দাবী তাদের দাবী হতে পারে না৷ শিক্ষকদের দুর্বস্থা থেকে আজকের পর্যায়ে আসতে যে ক’জন অবিসংবাদিতা শিক্ষক নেতা বিশেষ অবদান রেখেছেন তাঁদেরকে শিক্ষক সমাজ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে৷ যারা অবসর প্রাপ্ত নেতা আছেন তাদেরকে শিক্ষকেরা সম্মান করবে শ্রদ্ধাভরে৷ তাঁদের উচিত তাঁদের উত্তোরাধিকারী নেতা হিসেবে চলতি যোগ্যতম শিক্ষকদের কাছে দায়িত্ব দিয়ে তাঁদের মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে উপদেশ দেয়া৷ ক্ষমতা হাতে রাখলেই শ্রদ্ধা পাওয়া যায় না৷ অবসরে সম্মান আরো বাড়ে৷ জোর করে ভালবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জন করা যায় না৷
বিশ্বের অধিক সম্মানিত ও অকুতভয় নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা যিনি ২৭ বছর কারাবরণ করেছিলেন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, তার মত্যুর পর তাকে কিভাবে স্মরণ করা প্রয়োজন৷ তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি চাই আমার সম্পর্কে এরকম কথাই বলা হোক, এখানে এমন এক মানুষ শায়িত আছেন, যিনি পৃথিবীতে তার কর্তব্য সম্পাদন করেছেন। আমি চাই এটুকুই বলা হোক আমার সম্পর্কে।”
ইচ্ছাকৃতভাবে শিক্ষকতার চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পরও যেহেতু পদ পদবি ছাড়ছেন না একজন্য অাগে গোড়া পরিস্কার করতে হবে৷ গোড়া পরিস্কার হলে সম্পূর্ণ গাছই পরিস্কার থাকবে৷ এজন্য আগে নেতৃত্বে স্বচ্ছতা অানতে হবে৷ একজন যোগ্যতম কান্ডারি বের করতে হবে৷ কবি ফররুখের নাবিক পেলেই অধিকার ও সম্মানের সাগর পাড়ি দেয়া যাবে৷
”হে নাবিক! তুমি মিনতি আমার রাখো;
তুমি ওঠে এসো, তুমি ওঠে এসো মাঝি মাল্লার দলে
দেখবে তোমার কিশতি আবার ভেসেছে সাগর জলে৷”
আমাদের অধিকারের সাগর পাড়ি দিয়ে তীরে পৌছতে হলে আমাদের প্রয়োজন একজন দক্ষ নাবিক যার নেতৃত্বে জাহাজ পৌছবে গন্তব্যস্থলে৷
আমি একজন বেসরকারি শিক্ষক হিসেবে বিনীতভাবে সকল সংগঠনগুলোকে অনুরোধ করতে চাই-
”চলুন, আমরা সকল বেসরকারি শিক্ষক এক মঞ্চে বসি, নিজেদের সম্মান ও পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ি”
এই শ্লোগানকে সামনে রেখে ভবিষ্যতে অান্দোলন ফলপ্রসূ করতে দুটি প্রস্তাব রাখছি-

১. পুরানো সংগঠনগুলো থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে বাদ দিয়ে নিজেদের মধ্য থেকে কাউন্সিলের মাধ্যমে উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও কেন্দ্রীয় নেতা নির্বাচন করতে হবে৷ অবসর প্রাপ্ত নেতাদের সম্মান অক্ষুন্ন রাখতে তাঁদেরকে উপদেষ্টা হিসেবে রাখা যেতে পারে৷ এতে সম্মত না হলে তাদের লিস্ট তৈরি করে বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে যে, তাঁরা এখন দায়িত্বরত শিক্ষকই নন, শিক্ষকদের নেতা হন কিভাবে?
২. সকল সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্য থেকে জাতীয় ঐক্যের লক্ষ্যে একটি নেতৃত্ব প্যানেল তৈরী করতে হবে৷ জাতিয় কমিটির কমান্ড অনুযায়ী সকল শাখা কমিটি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে হবে৷

পরিশেষে বলবো, যিনি স্বার্থ ত্যাগ করতে পারেন না, যিনি অন্যকে নিজের চেয়ে অধিক যোগ্য নেতা হিসেবে মানতে পারেন না, তিনি কখনো নেতা নন৷ নেতৃত্ব সকল নেতার মহানেতা সর্বশক্তিমান সৃষ্টি কর্তার তরফ থেকে আসে৷ তাই নিজের অযোগ্যতাকে জাহির করতে নিজেই নিজকে নেতা ঘোষণা দেয়ার মানসিকতা পরিহার করে, কৌশলে আমরণ মিডিয়া ভিত্তিক নেতা না সেঁজে সাড়ে পাঁচ লক্ষ শিক্ষক ও তাঁদের পরিবার পরিজন-সন্তানাদির ভবিষ্যত এবং নিজেদের পেশাগত সম্মানের কথা স্মরণ করে নিজ স্বার্থ পরিহার করে সকল শিক্ষক এক মঞ্চে বসে জাতিয় ঐক্য গড়ে তোলার জন্য আহবান করছি৷

মোহাম্মদ মহসিন মিয়া
সহকারী প্রধান শিক্ষক