শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে বাড়ছে বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান

নিজস্ব নিজস্ব

প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১১, ২০২১

 

শিক্ষা বিস্তারে যুগ যুগ ধরে ধনী শ্রেণির ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিকবিদ, শিক্ষাণুরাগীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাবান্ধব ব্যক্তিদের দ্বারা এদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপণ করা হয়েছে৷ এগুলোর কিছু অংশ সরকারি এবং কিছু অংশ বেসরকারিভাবে পরিচালিত হচ্ছে৷ এক সময় জনসংখ্যা বৃদ্ধি অধিক ছিল৷ সে তুলনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল নগন্য৷ কিন্তু এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ আরো কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এত বেশি স্থাপিত হয়েছে এবং হচ্ছে যে অনেক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাম্য শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে স্কুল, কলেজ, মাদরাসার শিক্ষকেরা রীতিমত শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে শিক্ষার্থী নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে হচ্ছে৷
এ দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হরেক রকমের৷ যেমন- সরকারি, বেসরকারি, ব্যক্তি মালিকানাধীন, বিভিন্ন সংস্থা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিচালিত প্রতিষ্ঠান, এনজিও কর্তৃক পরিচালিত প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় গ্রুপ কর্তৃক পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি৷ আবার মাদরাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হচ্ছে- আলীয়া মাদরাসা, কওমী মাদরাসা ও বিভিন্ন ধর্মীয় বর্ণের আদলে মাদরাসা, ক্যাডেট মাদরাসা ইত্যাদি৷
যদি কোনো একটি গ্রাম্য বাজারের দিকে লক্ষ্য করা হয় তাহলে দেখা যাবে যে, সেখানে ৪-৫টি বিভিন্ন আকর্ষণীয় নাম কেজি স্কুল, ১-২ বিভিন্ন নামে মাদরাসা ব্যক্তি মালিকানাধীন চলছে৷ অথচ এর আশে পাশে আছে যুগোপযোগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং উচ্চ বিদ্যালয়৷ আবার কেজি স্কুলগুলোতে বিগত কয়েক বছর যাবত ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানোর হিরিক চলছে৷ অধিকাংশ এসমস্ত কেজি স্টাইলে বিভিন্ন প্রাইভেট স্কুলের শিক্ষকের যোগ্যতাই থাকে এসএসসি বা এইএসসি পাস৷ তা-ও আবার নিম্নমানের পাস৷ কারণ অধি মেধাবী শিক্ষার্থীরা যখন বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অন্য প্রতিষ্ঠানে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে অধ্যয়ণরত তখন পেছনের বেঞ্চের অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা কেজি স্কুল বা এসকল মানের স্কুলে শিক্ষকতায় ব্যস্ত৷ দেখা যায় যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চারদিক ঘেষেই পরীক্ষায় অধিক নম্বর দেয়ার তকমাধারী প্রাইভেট স্কুলগুলো স্থাপিত৷ সহজ সরল অভিভাবকেদেরকে বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে এসকল স্কুলে ভর্তি করানো হয়ে থাকে৷ এসকল প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের চিন্তন শক্তি বৃদ্ধি করার কোনো স্কোপ থাকে না; থাকে এক গাঁদা বই থেকে সীমিত কিছু পাতা মুখস্থ করানো আর পরীক্ষায় বস্তাভর্তি নম্বর প্রদানের প্রবণতা৷ অন্যদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের কোনো বালাই না থাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো খালি হয়ে যাচ্ছে যদি ও বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান অত্যন্ত মানসম্মত৷
অন্যদিকে কওমি মাদরাসা অধিক হারে বেড়ে গিয়ে আলীয়া মাদরাসায় ধীরে ধীরে ভর্তির ভাটা পড়ছে৷ কওমি মাদরাসায় পড়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীই পড়া শেষে বা অর্ধ-পড়া সম্পন্ন করে হয়ত মসজিদে ইমামের চাকরি নয়ত সুর ও মেধা ভালো হলে ওয়াজে বয়ান করে থাকেন৷ মাদরাসায় পড়লে সকল পেশাই গ্রহণ করা যাবে৷ কিন্তু মাদরাসায় পড়ুয়াদের কতজন ড্রাইভিং, কৃষক, শ্রমিক, অটোচালক, দোকানদার ইত্যাদিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন এবং নিচ্ছেন? মাদরাসা পড়া শেষে গ্রামে গিয়ে একটি মাদরাসার পাশে আরেকটি মাদরাসা স্থাপণকে বড় কাজ ও সেখানের শিক্ষকতাকেই তাদের অধিকাংশ গ্রহণ করে থাকেন৷
সাধারণ শিক্ষিতের একটা বিরাট অংশ বিভিন্ন প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার পেশা গ্রহণ করে থাকেন৷ এতে এসকল প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক পাওয়া যায় হরহামেশাই৷ যার ফলে কিছু ব্যবসায়ীরাও এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপণ করছেন ব্যবসার উদ্দেশ্যে৷ বছর শেষে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে মনমালিন্য হয়ে প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়ীরা একটি প্রতিষ্ঠানের পাশে আরেকটি প্রতিষ্ঠান স্থাপণ করেও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়াচ্ছেন৷ এতে সরকারি এবং সরকারি অনুদানে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থী সংখ্যা হুমকিতে পড়ছে৷
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংখ্যা ৬৩ হাজার ৬০১টি, স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসা সংখ্যা ৪ হাজার ৩০১২টি, দাখিল, আলীম, ফাজিল, কামিলের সাথেও এবতেদায়ী মাদরাসা আছে এবং কেজি স্কুলের সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার, আরো আছে ব্র্যাক কর্তৃক পরিচালিত বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার৷ প্রশ্ন জাগলো ৮৫ গ্রামের বাংলাদেশে প্রতিটি গ্রাম ও শহরের মহল্লায় কতটি স্কুল দরকার আর কতটি চলছে?
অন্যদিকে মোট ১০ হাজার জনসংখ্যায় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপণের অনুমতি থাকলেও বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৬৫টি, এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার এবং এমপিওবিহীন স্কুলের সংখ্যার আরো প্রায় ৫হাজার৷ মাদরাসার সংখ্যা প্রায় সাড়ে নয় হাজারের বেশি৷ তাহলে জনসংখ্যা বিবেচনায় এসকল মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরের স্কুলের পাশে আরো প্রাইভেট স্কুলের প্রয়োজন আছে কিনা? সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত স্কুল ও মাদরাসায় কাংখিত ও নিয়ম মাফিক শিক্ষার্থী ভর্তি করালে অতিরিক্ত আর কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপণের প্রয়োজন হবে না৷ শিক্ষার মান নিম্ন অযুহাতে পাশে অরেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপণ না করে চলমান প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষার মানোন্নয়নে তাগিদ দিতে হবে৷

লেখক – মোহাম্মদ মহসিন মিয়া
শিক্ষক৷