শিক্ষার সুযোগ মানুষের সাংবিধানিক অধিকার

প্রকাশিত: ৭:২৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৮, ২০২১

দেশের সরকারি হিসেবে ভর্তিকৃত প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা স্তরের শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর ৬৩% ঝরে পড়ে। বিষয়টি হাস‍্যকর বা মামুলি কোন ব্যাপার না বরং গুরুত্বসহকারে ভাবনার বিষয়। এই ঝরে পড়া বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীরা কোথায় অবস্থান করছে, নিশ্চয়ই আমার আপনার পরিবার তথা সমাজে? অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা, এরাই সমাজে নানাবিধ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে এবং করবে। শিক্ষা থেকে ঝরে পড়াদের পুনরায় মূল শিক্ষাধারায় ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। এখনি আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি বিচ্যুতি চিহ্নিত করে সংশোধনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। বৈশ্বিক মহামারী করোনা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। এতে যেমনি শিক্ষারথীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তেমনি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এখনই বই বিমুখ শিক্ষার্থীদের পূণরায় শ্রেনীকক্ষে ফেরানোর কৌশল ও কার্য্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সরকারি বেসরকারি শিক্ষা বৈষম্য আকাশ পাতাল ফারাক। যেখানে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থীর মাসিক বেতন ৭ টাকা মাত্র, সেখানে একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একই শ্রেনীর শিক্ষার্থীর মাসিক বেতন ১৫০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা। অথচ শহরকেন্দ্রিক সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে সরকারি কর্মকর্তা ও সমাজের ধনিক ও সম্পদশালী শ্রেণীর মানুষের সন্তানরা। যেখানে সম্পদশালী শিক্ষার্থীদের নামমাত্র খরচে সরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এতে দেশের অসচ্ছল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানদের সরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। বাধ‍্য হয়েই তাঁরা অধিক খরচে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখা পড়া করতে বাধ্য হয় এবং অর্থাভাবে ঝরে পড়ছে।

অপরদিকে আমাদের সামাজিক জীবনব‍্যবস্থায় যৌথ পরিবারগুলো ভেংগে একক পরিবারে জীবনযাপনে সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ফলে একক পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি থাকে সাধারণত একজনই, তাঁরা এই দূর্মূল্যের ঋ বাজারে পরিবারের ভরণপোষণের পর দুটি বা তিনটি সন্তানের শিক্ষা ব‍্যয় নির্বাহ করতে পারছে না। বেসরকারি শিক্ষার ব‍্যয় সাধারণ মানুষের সীমা অতিক্রম করেছে। এতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানরা অধিক হারে শিক্ষা বঞ্চিত হচ্ছে। দেশের বিশাল অঙ্কের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা বঞ্চিত রেখে জাতীয় উন্নয়ন অগ্রগতি অসম্ভব। আমাদের দেশে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের মাধ্যমে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানদের স্বল্প খরচে শিক্ষা লাভের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণের দাবিকে গণদাবিতে পরিনত করতে আমাদেরই অগ্রনী ভূমিকা পালন করতে হবে। এটা শুধু শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির কোন আন্দোলন নয়, এই আন্দোলন মানসম্মত শিক্ষা ও ঝরে পড়া শিক্ষা বঞ্চিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার আদায়ের আন্দোলন। আমি এই ন‍্যয় ও যৌক্তিক আন্দোলনে আমৃত্যু কাজ করে যাব, কারণ আমার উচ্চ শিক্ষা অর্জনে ঐ অসচ্ছল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের কষ্টার্জিত অর্থের অনুদান রয়েছে। তাই ঐ সাধারণ মানুষের সন্তানদের ও স্বল্প খরচে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে, এটা আমার ঋণ পরিশোধের অঙ্গীকার।

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বেসরকারি খাতে রেখে পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। দেশের সীমিত অর্থনীতির কথা বলে বলে শিক্ষাকে অবহেলিত করে রাখা হয়েছে যুগের পর যুগ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশ এখন অন্যান্য যে কোন সময়ের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। এখন দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে অর্থনৈতিক অভাব নেই, সরকারি নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছার অভাব। শুধুমাত্র শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘুষ দূর্নীতি অনিয়ম ও অপচয় রোধ করা সম্ভব হলে একযোগে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ করা এখনই সম্ভব। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পৌনে দুই শ`বছরের পুরাতন অনুদান প্রথার বিলুপ্তি ঘটাতে হবে। শিক্ষকতা পেশাকে মর্যাদাপূর্ণ ও আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা প্রদানের মাধ্যমে মেধাবীদের আকৃষ্ট করার কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। মানসম্মত শিক্ষায় চাই দক্ষ ও গুনগত মানের শিক্ষক। শিক্ষাই জাতীয় উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। চাই মানোন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, চাই এমপিওভুক্ত শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণ। কারো চোখ রাঙানিতে থেমে গেলে হবে না, এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ আন্দোলনে শিক্ষক শিক্ষার্থী অভিভাবকদের অগ্রনী ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে।

উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি, আসুন প্রান্তিক অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর সন্তানের কম খরচে শিক্ষার সুযোগ দিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণের দাবি আদায়ে অংশ নিয়ে আমাদের ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করি।

শুভেচ্ছান্তে
মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম