শিক্ষকদেরকে মাস্টার বলা হয় কেন?”

নিজস্ব নিজস্ব

প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২:৪৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩০, ২০২১

মাস্টার বা মাস্টর(ব্যঙ্গাত্মকভাবে)আমাদের দেশে একটি অতি পরিচিত শব্দ; বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে৷ যারা প্রাইমারি কিংবা হাই স্কুলে শিক্ষকতা করেন তাদেরকে গ্রামের মানুষ ‘মাস্টর’ আবার একটু শিক্ষিত হলে ‘মাস্টার’ বলেই সম্বোধন করেন৷ মজার ব্যাপার হচ্ছে শিক্ষকের স্ত্রী যদি মূর্খও হোন তাহলেও তাকে মাস্টন্নি/মাস্টরনি সম্বোধন করা হয়ে থাকে৷ অন্যদিকে এম.এ পাস করে কোন মহিলা শিক্ষকতা করলে তিনিও সমাজে মাস্টন্নি/মাস্টরনি উপাধিতেই পরিচিত থাকেন৷ নিজের সন্তানের সাথে এক ঘণ্টা সময় দেয়া হয় না অথচ ছাত্র ছাত্রীদেরকে নিজের সন্তানের চাইতেও বেশি আপন ও আদর করে প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা সময় ব্যয় করে শিক্ষকেরা সংসারে আর্থিক টানপোড়নের মধ্যেই জাতির সন্তানেরকে সুশিক্ষা দিয়ে থাকেন৷ আর সে গুরুদেরকে এক শ্রেণির লোকেরা গ্রামে, রাস্তা-ঘাটে, হাট-বাজারে কিংবা অন্য কোন লোকালয়ে দেখা হলে কিছু বলতে চাইলে তাঁদেরকে মাস্টর(মাস্টার) বলে হয়ত সম্মান-আধাসম্মান বা ব্যঙ্গাত্মকভাবে মাস্টর/মাস্টার বলে সম্বোধন করে থাকেন৷ এমনকি হঠাৎ সম্পদের মালিক হওয়া কিছু অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের পড়াশোনার খবরা খবর নেন এভাবে- ”মাস্টর, কী খবর? আমার পুতের ক্যালাশ-ট্যালাশ পাননি? খেয়াল-টেয়াল রাইখেন৷” এক সময় গ্রামে শিক্ষকদেরকে অতি বুদ্ধি ও বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং বিয়ে, বিবাদ মিমাংসাসহ যেকোন সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে শিক্ষকদের কাছ থেকে পরামর্শ নেয়া হতো৷ আর এখন গ্রামের হঠাৎ মোটাসোটা কোন লোক যার কিছু পয়সা হয়েছে বা কোন রাজনৈতিক লোকের সাথে পরিচিত আছে এবং বড় ভাই খেতাবপ্রাপ্ত বা যার ৩-৪ জন ভাই বিদেশে বেশি টাকা ইনকাম করে তারা এখন অধিক বুদ্ধিমানের ভান করে ও কোন বিচার আচারে শিক্ষকদের প্রাপ্তি হয়- ”মাস্টর আপনি এটা বুঝবেন না৷ বাচ্চা পড়াইয়া আপনার মাথায় কিছু নাই৷ আপনি চুপ কইরা শোনেন৷” সাধারনত, যিনি চিকিৎসা সেবা দেন তাঁকে ডাক্তার বলা হয়, যিনি ব্যাংকে চাকরি করেন তাঁকে ব্যাংকার বলা হয়, যিনি  গাড়ি চালান তাকে ড্রাইভার বলা হয়, যিনি অফিসের উচ্চ পদে চাকরি করেন তাঁকে অফিসার বলা হয়৷ তাহলে যারা শিক্ষাদান করেন তাদেরকে মাস্টার বা মাস্টর  বলা হয় কেন? শিক্ষাদেন করলে তো শিক্ষকই৷ মাস্টর বা মাস্টার বলবে কেন? সব জায়গায় শিক্ষক সম্বোধন করতে হবে তাও নয়৷ ভাই বলে সম্বোধন করলে অতি আপনজন মনে হয়৷ অন্যের কাছে কেমন মেন হয় জানি না তবে আমার কাছে মাস্টর বা মাস্টার শব্দি অতি যন্ত্রণা ও অপমানের মতো মনে হয়! যদি শিক্ষক হলে মাস্টর বা মাস্টার বলতে হয় তাহলে শুধু প্রাইমারী ও উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেলায় কেন? কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ান তাদেরকে মাস্টর বা মাস্টার বলতে শোনা যায় না৷ শিক্ষকতায় নতুন যোগদান সাধারণ মানুষ কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে প্রফেসর উপাধীতে ডাকতে শোনা যায়৷ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরই যেন মাস্টর বা মাস্টারির এক বিশেষ স্থান! Master ইংরেজি শব্দ, এর অর্থ হচ্ছে- মালিক, মনিব, কর্তৃত্বকারি,কর্তৃত্বকর, নিয়ন্ত্রনকারি, শাসক ইত্যাদি৷ ইংরেজিতে বিশ্লেষণ করলে Someone who has control over something or someone. Owner of an animal or slave.(nautical) The captain of a merchant ship; a master mariner. Someone who employs others. An expert at something. A tradesman who is qualified to teachapprentices. তাহলে উপরোক্ত Words এর যেকোন একটি অর্থের প্রেক্ষিতে শিক্ষকদেরকে কি মাস্টার বলা যায় কিনা? শিক্ষকেরা দেশের সকল নাগরিককে সুনাগরিকে পরিণত করেন, তারা জ্ঞান দান করেন এবং মানুষকে মানব সম্পদে পরিণত করেন৷ শিক্ষকদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েই বড় বড় কর্মকর্তা ও উচ্চ পদস্থ সম্মানিত ব্যক্তি বর্গ হয়ে থাকেন ৷ অথচ শিক্ষকদেরকেই সমাজে উপযুক্ত সম্মান না দিয়ে মাস্টার বা মাস্টর বলে সম্বোধন করে কেউ কেউ ব্যঙ্গও করে থাকেন৷ মাঝে মাঝে কোন শিক্ষক যদি গ্রামে বা কোন অনুষ্ঠানে কোন অপরিচিত লোকদের সাথে একত্র হোন বা পরিচিত হতে হয় তখন তাদের মধ্য থেকে অপরিচিত লোকটির সাথে শিক্ষককে পরিচয় করানো হয় এভাবে, ”সে অমুক স্কুলে মাস্টারি/মাস্টরি করে৷” এ ভাষাটা শোনতে কেমন লাগে? ঐ শিক্ষকের মাথাটা নিচুই হয়৷ কিছু ক্ষেত্র বিশেষ স্থান ছাড়া শিক্ষকতার চেয়ে অবহেলার কাজ বাংলাদেশে আর নেই৷ বেসরকারি শিক্ষক হলে তো কোনো কথাই নাই৷ পরিচয়টা তো এভাবেও দেয়া যায় যে, ” তিনি অমুক স্কুলের শিক্ষক৷ তাহলে শুনতে অবশ্যই ভাল লাগে এবং শিক্ষকের মনেও তৃপ্তি পান৷” আমি কয়েকজন শিক্ষকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ”যখন লোকেরা ‘মাস্টার’ বা ‘মাস্টর’ বলে ডাকে, তখন শুনতে কেমন লাগে?” উত্তরে সবাই বলেছিলেন ”এ কথাটি একটি অপমানজনক ভাষার মতো লাগে৷” বাংলাদেশের কোনো শিক্ষিত লোক বলতে পারবেন না যে, উনি কোনো শিক্ষকের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন নাই ৷ কি আজব ব্যাপার! শিক্ষকদেকে মাস্টার/মাস্টর বলে সম্বোধন করা হয়,  আর খাজনা দিতে গিয়ে তহশিলদারকে, এমনকি এনজিও কর্মী যারা কিস্তির টাকা গ্রহণ করেন তাদেরকেও ”স্যার”বলে  সম্বোধন করা হয়৷ আমি তাদের কোন অংশেই ছোট করে দেখছি না ৷ একই গ্রেডের একজন শিক্ষক ও একজন সরকারি অফিসের কর্মকর্তা  যদি একই কাজের জন্য কোন সরকারি বা বেসরকারি অফিসে যান তাহলে শিক্ষকের চেয়ে ঐ ব্যক্তিকে যে কতো বেশি মূল্যায়ণ করা হয় ও অধিক গুরুত্ব দিয়ে তাড়াতাড়ি কাজটি সম্পন্ন করে দেয়া হয় তা বাস্তবেই দেখা যায়৷ আর শিক্ষকের ক্ষেত্র বিশেষ ভাষায় মাস্টরের একই কাজটি করতে একজোড় জুতার কিছু হলেও ক্ষয় করতে হয়৷ আমার এক বন্ধু শিক্ষক ও সাংবাদিক৷ দু’জনেই একসাথে একটি অফিসে গিয়েছিলাম কোনো একটি কাজে৷ শিক্ষক পরিচয়ে পিয়নের মাধ্যমে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি চাইলে জবাব আসলে স্যার এখন বিজি পরে আসেন৷ একটু পরে বন্ধু সাংবাদিকতার পদ ছাপানো ভিজিটিং কার্ড দিয়ে পিয়নের মাধ্যমে সাক্ষাতের অনুমতি চাইলে সাথে সাথে অনুমতি পেয়ে গেলাম৷ যদি আমার সাথের জন তার শিক্ষকতার পরিচয় দিতেন হয়ত সারাদিনও ভেতরে যাওয়ার অনুমতি মিলত না!

পরিশেষে বলতে চাই মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা বদলিয়েছে৷ শিক্ষকের ক্ষেত্রে সেটি আপডেড না হয় যেন ডাউনে যাচ্ছে! আগে গৃহিনীকে বলা হতো হাউজ ওয়াইফ; এখন বলা হয় হোমমেকার৷ অফিস সহকারিরা উত্তরাধীকারি পদের নামের পরিবর্তে অফিস সেক্রটারি পদে মূল্যায়ণ হতে চাচ্ছেন৷ এখন সময় শিক্ষকদেরকে মাস্টর বা মাস্টার শব্দে সম্বোধন সম্পূর্ণ বিলোপ করে দেয়া৷

লেখক- মোহাম্মদ মহসিন মিয়া
শিক্ষক ও লেখক৷