ব্রিটেনের ভিসার শর্ত শিথিল করার কারণ

প্রকাশিত: ৬:৪৪ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০২০

ব্রিটেনে অতি সম্প্রতি ওয়ার্ক পার‌মিট আর স্টুডেন্ট ভিসার শর্ত শি‌থিলতার ঘোষণায় নিম্নবিত্ত দেশ বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত দেশের সাধারণ মানুষ আনন্দে আত্নহারা। তবে প্রশ্ন নিজ ব্রিটেন নিজ দেশের লাখ লাখ কাগজপত্রহীন অবৈধ মানুষদের বেকার রেখেই হঠাৎ নতুন ভিসায় শর্ত শিথিল করল কেন?

 

ব্রেক্সিট আর ক‌রোনার কব‌লে ব্রিটেন এখন বিপর্যস্ত। ব্রিটে‌নের লাখ লাখ নাগ‌রিক বেকার। এর বাইরেও কর্মীর দরকার হ‌লে অবৈধ কাগজপত্রবিহীন‌দের বৈধতা দিতে পারতো সরকার। তা‌দের দীর্ঘদিন এ দেশে কাজের অভিজ্ঞতাও র‌য়ে‌ছে। আর কাগজপত্র ঠিক না থাক‌লেও তারা গোপ‌নে এ দেশে কাজ কর‌ছেন। কিন্তু সে কা‌জের ট্যাক্স, এনআই‌য়ের অর্থ থে‌কে সরকার ব‌ঞ্চিত হ‌চ্ছে।

 

 

 

এসব মানুষকে ফেলে রেখে নতুন লোক নিয়ে আসাকে বি‌ভিন্ন ফির না‌মে সরকা‌রের আয় বাড়া‌নো আর মন্দা তাড়া‌নোর পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সমালোচকরা। ওয়ার্ক পার‌মিট ভিসায় কোনও শিক্ষাগত যোগ‌্যতা লাগ‌বে না। শুধু ইং‌রে‌জি‌তে প্রাথ‌মিক দক্ষতার ‌বি ওয়ান (B1) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হ‌তে হ‌বে। এক‌টি কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক তা‌কে নি‌য়োগ দি‌তে হ‌বে।

 

এক্ষেত্রে ভিসার শর্ত শিথিলকে ব্রিটিশ সরকারের আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তারা বল‌ছেন, বি‌ভিন্ন ভিসায় ব্রিটে‌নে যারা আস‌বেন, তাদের আ‌য়ের বড় অংশই ব্যয় হ‌বে ভিসা টি‌কি‌য়ে রাখার বি‌ভিন্ন ফি, ট্যাক্সসহ নানা খা‌তে। তা‌দের আয় করা টাকাগু‌লোর বড় অংশ যা‌তে ঘু‌রেফি‌রে ব্রিটিশ সরকা‌রের হা‌তে ফি‌রে যায়, সে রকম কৌশল রে‌খেই প‌য়েন্ট বেইজড ভিসা সিস্টেম প্রতি‌নিয়ত আপ‌ডেট করা হ‌চ্ছে।

 

 

 

দেশ‌টির অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিকস (ওএনএস)-এর সর্বশেষ ত‌থ্য অনুযায়ী, ব্রিটে‌নে গত তিন বছ‌রের ম‌ধ্যে বেকার‌ত্বের হার এখন সর্বোচ্চ পর্যা‌য়ে র‌য়ে‌ছে। আগ‌স্টে বেকার‌ত্বের হার বে‌ড়ে‌ছে ৪. ৫ শতাংশ যা পূর্ববর্তী তিন মা‌সের তুলনায় ৪.১ শতাংশ বেশি। ব্রিটে‌নের অর্থনী‌তির সব সূচক প‌ড়‌তির দি‌কে।

 

নিকট অতী‌তে দেখা গে‌ছে, ব্রিটে‌নে যখনই আর্থিক মন্দা দেখা দিয়েছে, তখনই স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক পার‌মিট ভিসার শর্ত শি‌থিল ক‌রে মানুষ আসার পথ সুগম ক‌রে দেয় সরকার। ভিসা আবেদনকারীদের বি‌ভিন্ন ফির মাধ্যমে সরকার সরাস‌রি আর্থিকভাবে লাভবান হয়। পরবর্তী‌তে ব্রিটে‌নে ভিসা পুনঃনবায়ন প্রক্রিয়ায় আবেদনকারীরা বিপুল প‌রিমাণ অর্থ সরকার‌কে বি‌ভিন্ন পর্যা‌য়ে প‌রি‌শোধ ক‌রেন। দ্বিতীয় সা‌রির ক‌লেজ বিশ্ব‌‌বিদ্যালয়গু‌লো টি‌কি‌য়ে রাখায় বি‌দেশি শিক্ষার্থী‌দের প‌রি‌শো‌ধিত ফি বরাবরই বড় অবদান রে‌খে এসেছে।

 

ব্রিটে‌নে বর্তমা‌নে কী ওয়ার্কার হি‌সে‌বে কর্মরত হাজা‌র হাজার ‌বি‌দেশি কর্মী জানুয়ারি থেকে চালু হওয়া প‌য়েন্ট বেইসড ভিসা সি‌স্টেমে বিপা‌কে পড়‌বেন বলে আশঙ্কা কর‌ছে বি‌ভিন্ন ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানই। অক্স‌ফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গ‌বেষণায় বলা হ‌য়ে‌ছে, বহু কর্মরত ওয়ার্কার কী ব্রিটে‌নের কা‌জের ভিসার নতুন শ‌র্ত পূরণে সক্ষম হ‌বেন না। এমন অবস্থায় নতুন কর্মী‌দের প‌রি‌স্থি‌তি কী হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

 

 

 

কল্যাণ রা‌ষ্ট্র হি‌সে‌বে ব্রিটেন ক‌রোনার শুরু থে‌কেই নিজ দে‌শের লাখ লাখ কাজ হারা‌নো মানুষ‌কে বেকারত্ব ভাতাসহ নানা আর্থিক সু‌বিধা দি‌চ্ছে। খোদ বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ব‌রিস জনসন লন্ড‌নের মেয়র থাকাকা‌লে ও সর্বশেষ ২০১৯ সা‌লের জুলাইতে দেশ‌টি‌তে বসবাসরত প্রায় এক লাখ বৈধ কাগজপত্রবিহীন বাংলা‌দেশিসহ পাঁচ লক্ষা‌ধিক অন‌থিভুক্ত অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়ার আশ্বাস দি‌য়ে‌ছি‌লেন।

 

কিন্তু ব‌রিস জনস‌নের সরকার নতুন ক‌রে ওয়ার্ক পার‌মিট ভিসার শর্ত শি‌থিল করে নতুন ক‌রে কর্মী আনার প‌ক্ষে পদ‌ক্ষেপ নি‌য়ে‌ছে। তাই এটা এখন স্পষ্ট যে বৈধ কাগজপত্রবিহীন‌দের বৈধতা দেওয়ার প‌রিকল্পনা স‌রকা‌রের নেই। কারণ ছয় লক্ষা‌ধিক মানুষ‌কে বৈধভা‌বে কা‌জের সু‌যোগ দে‌ওয়ার পাশাপা‌শি নতুন বি‌দেশি কর্মীদের কা‌জের ক্ষেত্র এই মুহূর্তে ব্রিটে‌নে নেই।

 

বাস্তবতা হলো, ক‌রোনাকাল পার হ‌লেও সম্ভাব্য নো ডিল ব্রেক্সি‌টের পর জব মা‌র্কেট ও অর্থনী‌তি আপদৎকালীন প‌রি‌স্থি‌তিতে বরং নে‌তিবাচকতায় মোড় নেওয়ার শঙ্কাই বে‌শি। আর ওয়ার্ক পারমিট ভিসার ক্ষে‌ত্রেও সরকা‌রের বেঁধে দেওয়া ন্যূনতম আয়সীমার শর্ত পূর‌ণে অনে‌কে কাজ না ক‌রেও সরকা‌রের ট্যাক্স প‌রিশো‌ধে বাধ্য হন, বৈধভা‌বে দেশ‌টি‌তে থাকার সু‌বিধার আশায়।

 

এমন ঘটনা অতী‌তে হরহা‌মেশাই দেখা গে‌ছে। ঘ‌টে‌ছে একই ওয়ার্ক পার‌মিট একা‌ধিক ব্যক্তির কা‌ছে বি‌ক্রি, ওয়ার্ক পার‌মি‌টে মানুষ আনার পর কোম্পানি বন্ধ ক‌রে দেওয়ার প্রতারণাও। যা‌দের ভিসার মেয়াদ আ‌গেই শেষ হ‌য়ে গে‌ছে, তারা দে‌শে ফেরত গিয়ে ওয়ার্ক পার‌মি‌টে নতুন ক‌রে ফিরে আস‌তে চ‌াইলে সে‌ক্ষে‌ত্রে সম্ভাবনা কত‌টুকু?

 

যারা দেশটিতে অবৈধ বা কাগজপত্রহীন তাদের ক্ষে‌ত্রে ভিসা না পাওয়ার সম্ভাবনাই বে‌শি। ভিসার মেয়াদের প‌রে এ দেশে থাকার মা‌নে ইমিগ্রেশন আইন ভঙ্গ করা। এছাড়া ওভার‌স্টেয়ার কেউ একবার দেশ থে‌কে বে‌রি‌য়ে গে‌লে তার বসবাসজ‌নিত ক‌ন্টি‌নিউ‌য়েশ‌নের সু‌বিধা হারা‌বেন। ‌আর যারা আস‌লেই লেখাপড়া কর‌তে চান, ব্রিটে‌ন মূলত তাদেরই স্বাগত জানা‌তে চায়।

 

উল্লেখ্য, এই মুহূ‌র্তে ১৫ লাখ ২০ হাজার মানুষ কাজ হা‌রি‌য়ে বেকার। কেবল চল‌তি বছ‌রের জুন থে‌কে আগস্ট পর্যন্ত ১৫ লাখের বে‌শি মানুষ কাজ হারান। ২০০৯ সা‌লের পর থে‌কে গত ১১ বছ‌রের ম‌ধ্যে বেকার‌ত্বের হার সর্বোচ্চ পর্যা‌য়ে পৌঁছে‌ছে।