“বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর তহবিল পরিচালনা নিয়ে কিছু কথা ও প্রস্তাবনা”

প্রকাশিত: ৮:০২ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২১

আমারা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, ত্রিশ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধার রক্ত ও দুই লক্ষ মা- বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি এই বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর অন্তরে লালিত স্বপ্ন ছিলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সোনার বাংলাদেশ এবং দেশের মানুষের মুক্তি। ব্যক্তিগত কোন লোভ লালসা বঙ্গবন্ধুর জীবনে কখনো ছিলো না। তিনি নিজেকে বড় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য কখনো রাজনীতি করেন নি। তিনি সব সময় এ দেশের গরীব মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য, দেশের মানুষ কে জুলুমের শিকার হতে মুক্ত করার জন্য, দেশ থেকে অন্যায় ও দূর্নীতি দূর করার জন্য রাজনীতি করেছেন। তিনি স্বপ্ন দেখতেন একদিন স্বাধীন বাংলাদেশ এবং বাঙ্গালী জাতি পৃথিবীর বুকে মাথা উচু করে দাড়াবে। একদিন বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্র ও স্বনির্ভর জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি স্বপ্ন দেখতেন এদেশ একদিন শিক্ষা দিক্ষায় উন্নত রাষ্ট্র গুলোর সাথে তাল মিলিয়ে চলবে এবং দেশ থেকে অন্ধকার দূর করে আলোকিত জাতি হিসেবে এদেশের মানুষ বিশ্বের বুকে মাথা উচু করে দাড়াবে। এ প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু একটি সদ্য স্বাধীন দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্য থেকেও দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা কে জাতীয় করণ করেছিলেন। আমাদের দূর্ভাগ্য আমরা আমাদের মহান নেতাকে তার স্বপ্ন পূরণ করতে সময় দেই নাই। তিনি সোনার বাংলার স্বপ্ন নিয়েই জীবন বিসর্জন দিয়েছেন।
বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা হয়তো আরোও অনেক আগেই জাতীয় করণ হয়ে যেত।

আজ এ স্বাধীন বাংলাদেশের শতকরা ৯৭% সাধারণ জনগণের সন্তানদের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা দানে নিয়োজিত আছেন প্রায় পাঁচ লক্ষ বেসরকারি এমপিও ভুক্ত শিক্ষক ও তাদের সহযোগী কর্মচারীবৃন্দ। বর্তমান সরকারের সদিচ্ছায় এসকল শিক্ষক- কর্মচারী সরকারের কোষাগার থেকে শতভাগ বেতন পেলেও কিছু অসাধু শিক্ষক নেতা এবং আমলাদের ছলচাতুরীর কারণে, দিনদিন সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের মাঝে বৈষম্য আকাশচুম্বী পরিনতির দিকে চলে যাচ্ছে। বর্তমান সরকার যখন ২০১৫ সালে পে-স্কেল ঘোষণা করেন এবং বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট সিস্টেম চালু করেন তখন থেকেই বেসরকারি শিক্ষকদের বৈষম্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ যখন যুগের পর যুগ পূর্ণাঙ্গ উৎসব বোনাস ভোগ করছেন, সেখানে বেসরকারি শিক্ষকগণ ২৫% উৎসব বোনাস পেয়ে থাকেন তাও আবার উৎসবের পর। চিকিৎসা ভাতার কথা আর নাই বললাম। ৫০০/- দিয়ে মাসে পৃথিবীর কোথাও চিকিৎসা নেয়া যায় কিনা প্রশ্ন থেকে যায়। আর বাড়ি ভাড়া মাসিক ১,০০০/- টাকা। যদিও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাদার অফ হিউমিনীটি, জননেত্রী শেখ হাসিনার একান্ত ইচ্ছায় বেসরকারি শিক্ষকদেরকে পে-স্কেলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, কিন্তু কতিপয় আমলার খামখেয়ালিপনায় ইনক্রিমেন্ট ও বৈশাখী ভাতা প্রদানের বেলায় তাদেরকে বঞ্চিত করা হয় দুই বৎসর। এখানে বেসরকারি শিক্ষক- কর্মচারীবৃন্দ বঞ্চিত হন দুটি ইনক্রিমেন্ট এবং দুই বৎসরের বৈশাখী ভাতা থেকে। সর্বশেষ আবারো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই বেসরকারি শিক্ষকদের কে বার্ষিক ৫% ইনক্রিমেন্ট ও ২০% বৈশাখী ভাতা প্রদান করা হয়। এবার বেসরকারি শিক্ষকবৃন্দ যখন স্বস্থির নিঃশ্বাস নিতে যাচ্ছিলেন তখনি কালবৈশাখী ঝড়ের মত শিক্ষদের মাথায় বিনা মেঘে বজ্রপাত পরতে শুরু করলো। শিক্ষক নামধারী কতিপয় স্বঘোষিত শিক্ষক নেতা তাদের হীন স্বার্থ হাসিলের জন্য ৫% ইনক্রিমেন্ট চালু হওয়ার পর থেকেই সেখান থেকে আবার অতিরিক্ত ৪% কর্তন করা শুরু করলো কল্যাণ ও অবসর তহবিলের নামে। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী কল্যাণ ও অবসর তহবিল নামক দুটি ফান্ডে, শিক্ষকদের মাসিক সরকারি বেতন থেকে প্রতি মাসে কল্যাণ তহবিলে ২% এবং অবসর তহবিলে ৪% হারে কর্তন করে জমা রাখা হতো। এর জন্য একজন শিক্ষক তার কর্মজীবন শেষ করে যখন অবসর গ্রহণ করবেন তখন তার বেতন থেকে কর্তনকৃত জমানো টাকা ও এর মুনাফা এবং সরকারের তরফ থেকে ভর্তুকি বাবদ প্রদত্ত অর্থ থেকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক কে কল্যাণ তহবিল হতে ঐ শিক্ষক যত বৎসর চাকুরী করেছেন তত মাসের বেতনের সমপরিমাণ টাকা, আর অবসর তহবিল থেকে আনুপাতিক হারে ২৫ বৎসর চাকুরীর জন্য সর্বোচ্চ ৭৫ মাসের বেতনের সমপরিমাণ টাকা প্রদান করার কথা। কেউ ২৫ বৎসরের কম সময় চাকুরী করে অবসরে গেলে অবসর তহবিলের টাকা আনুপাতিক হারে কম পাবে। এখন প্রশ্ন হলো পূর্বে একজন শিক্ষক কল্যাণ তহবিলে ২% টাকা জমা করে যে সুবিধা পাওয়ার কথা,এখন ঐ তহবিলে ৪%( পূর্বের ২%+ নতুন ২%) টাকা জমা করে কেন তাকে একই সুবিধা দেওয়া হবে? অনুরূপ ভাবে অবসর তহবিলে ক্ষেত্রেও পূর্বে ৪% টাকা জমা করে যে সুবিধা পাওয়ার কথা, এখন ৬% ( পূর্বের ৪%+ নতুন ২%) হারে টাকা কর্তন করে কেন তাকে একই সুবিধা দেওয়া হবে? এ প্রশ্ন যখন শিক্ষক নামধারী নেতাদের কাছে করা হয় তখন তাদের পক্ষ থেকে উত্তর আসে যে, আগে বেতন ছিলো ১৫০০০/- স্কেলে(প্রধান শিক্ষকের), এখন ২৯,০০০/- স্কেল। বেতন দ্বিগুন বৃদ্ধি পেয়েছে তাই কর্তন বেশি করলেও কোন লস হয় না শিক্ষদের। আমার প্রশ্ন হলো ঐ নেতার নিকট, আগে ১৫ হাজার টাকা থেকে মোট ৬% কর্তনে ৯০০/- টাকা হতো, নতুন স্কেলে ২৯ হাজার টাকা থেকে মোট ৬% হারে কর্তন করা হলে ১,৭৪০/- টাকা হয়। তাহলে স্কেল যেমন দ্বিগুন হয়েছে কর্তন ও প্রায় দ্বিগুন হয়েছিল, কিন্তু ঐ নেতাগণ এখন অতিরিক্ত ৪% কর্তন বৃদ্ধি করে ১,৭৪০/- টাকার পরিবর্তে ২,৯০০/- টাকা নিয়ে নিচ্ছেন। অতিরিক্ত ১,১৬০/- টাকা কর্তনের বিপরীতে শিক্ষকদের কি সুবিধা দেওয়া হলো আমি জানতে চাই। আবার তিনি বলেন বার্ষিক ৫% ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার কারণে শিক্ষদের বেসিক বেতন বেড়ে যায় এবং তাদের দাবীর টাকার পরিমানও বেড়ে যায়। ইনক্রিমেন্ট বাড়লে বাড়তি টাকার উপর কর্তন কি থেমে থাকে? সহজ সরল শিক্ষকদের সাথে আর কত তামাশা করবেন? শিক্ষদের ঘাম জড়ানো বেতন থেকে টাকা রেখে সে টাকায় শিক্ষক নামধারী নেতাগণ এসি রুমে বসে রাজনীতি করবে, এসি গাড়ি চালিয়ে সারা দেশ সফর করবে, ঢাকা শহরে ফ্ল্যাট বাড়ি কিনে রাজার হালে বসবাস করবে আর অসহায় শিক্ষক তার পাওনা টাকা পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর তাদের পেছনে ধর্না দিবে? অসহায় শিক্ষক সময়মত টাকা না পেয়ে অনাহারে, অর্ধাহারে বিনা চিকিৎসায় দিনাতিপাত করবে অথবা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। শিক্ষকের পাওনা টাকা পাওয়ার জন্য কল্যাণ ও অবসর তহবিলের অফিসে মোটা অংকের টাকা উপঢৌকন হিসেবে ঐ নেতাদের কে দিতে হবে, এটার জন্যই কি বঙ্গবন্ধু দেশটাকে স্বাধীন করেছিলেন?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি দেশের জন্য, দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, আপনি বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নিত করেছেন। আপনার পিতার যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে আপনি বাংলাদেশ কে বিশ্ব দরবারে নেতৃত্বের আসনে বসিয়েছেন। কতিপয় দূর্নীতিবাজ নেতা, আমলা, ও চাটুকারেরা আপনার এ অর্জন গুলোকে ম্লান করার হীন কাজে লিপ্ত হয়েছে, যাতে করে দেশের বৃহদাংশ জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে। সময় থাকতে আপনি এইসকল দূর্নীতিবাজ নেতা, আমলা ও চাটুকার দের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। তাহলে দেশের মানুষের কাছে আপনার গ্রহণ যোগ্যতা আকাশচুম্বী পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াবে।

এবার বেসরকারি শিক্ষকদের কল্যণ ও অবসর তহবিল পরিচালনা করার জন্য কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করা হলোঃ
১। কল্যাণ ও অবসর তহবিল পরিচালনার জন্য আলাদা করে কোন অফিস থাকবে না, কোন কর্মকর্তা – কর্মচারী থাকবে না।
২।এজন্য কোন পরিচালনা বোর্ড প্রয়োজন নাই।
৩। শিক্ষকদের বেতন থেকে মাসিক যে টাকা কর্তন করা হয় সে টাকা সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও মহাপরিচালক মাউশির যৌথ হিসেবে জমা থাকবে।
৪। কল্যাণ ও অবসর তহবিলের জন্য সরকার প্রতি বৎসর বাজেট থেকে আনুপাতিক হারে ভর্তুকি প্রদান করবে এবং সে টাকা ইএফটির মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের হিসাবে জমা হয়ে যাবে।
৫। শিক্ষকের বয়স পূর্ন করে অবসরে চলে গেলে ঐ শিক্ষক যে ব্যাংক হিসাব নম্বর থেকে তার বেতন- ভাতা উত্তোলন করতেন, ঐ হিসাব নম্বরে অবসর গ্রহনের পরের মাসে তার সমুদয় পাওনা টাকা ইএফটির মাধ্যমে প্রদান করতে হবে।
৬। কোন শিক্ষক মৃত্যুবরণ করলে বা স্বেচ্ছায় অবসরে চলে গেলে অথবা শারীরিক অক্ষমতার জন্য পদত্যাগ করলে ঐ শিক্ষকের বৈধ ওয়ারিশ, স্বেচ্ছায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অথবা পদত্যাগি শিক্ষক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধানের মাধ্যমে উপযুক্ত কাগজপত্র সহ অনলাইনে মহাপরিচালক বরাবর আবেদন করবেন এবং পরবর্তী একমাসের মধ্যে ঐ মহাপরিচালক মহোদয় ইএফটির মাধ্যমে শিক্ষকের সমুদয় পাওনা টাকা সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক একাউন্টে প্রেরণ করবেন।
৭। এ দুটি তহবিলের জন্য মাউশি তে এমপিও শাখার মত একজন উপপরিচালকের নেতৃত্বে একটি উইং রাখা যেতে পারে।
৮। অবসর গ্রহন কারী শিক্ষকের নাম বর্তমানের মত অটোমেটিক এবং পদত্যাগি ও স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহনকারী শিক্ষকের নাম সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান যে আবেদন করবেন তার মাধ্যমে এমপিও থেকে কর্তন করতে হবে।
লেখকঃ
মোহাম্মদ ফজলুল হক ফকির
প্রধান শিক্ষক
রায়পুরা আর.কে.আর.এম উচ্চ বিদ্যালয়
রায়পুরা, নরসিংদী।
এবং
সহসভাপতি,
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম
কেন্দ্রীয় কমিটি।