নৈতিকতার অবক্ষয়ে পরিবার ভাঙ্গন: অসহায় বৃদ্ধরা

প্রকাশিত: ৬:০৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৫, ২০২০

নিজে না খেয়ে যিনি সন্তানকে খাওয়ান, নিজে ভেজা বিছানায় ঘুমিয়ে যিনি সন্তানকে শুকনো স্থানে ঘুম পাড়ান, নিজে নদিতে ডুবে গিয়েও যিনি সন্তানকে আগলিয়ে রাখেন, তিনি মমতাময়ী মা ৷ সন্তানের হাঁসি দেখলে তার পেট ভরে যায়, সন্তানের কান্না দেখলে তার চোঁখে পানি আসে, সন্তান না ঘুমালে তিনি ঘুমান না৷ নিজের পরনের জামাটি ছেড়া ও অতি পুরানো, চশমার পাওয়ার বাড়ানো দরকার হলেও চশমাটি না পাল্টিয়ে, নিজে পুরানো জামা আয়রন করে ঈদ করে সন্তানকে যিনি নতুন জামা  কিনে দেন, স্কুলে পাঠান, তিনি জন্মদাতা বাবা ৷ সন্তানের ভবিষ্যত ভাবতে ভাবতে নিজে সম্পূর্ণ আয় সন্তানের পিছনে ব্যয় করে বৃদ্ধ বয়সে অসহায় হয়ে পড়েন ৷ আশায় থাকেন শেষ বয়সে সন্তান তাদের দেখাশোনা করবেন ৷
ছেলে বড় হলে প্রতিষ্ঠিত হলে আনন্দ উল্লাস করে ঘরে যে ছেলের বউটি ঘরে আসে, সে বউটির কি মনে থাকে তার স্বামির পেছনে শ্বশুর শ্বাশুরীর কতটুকু অবদিন ছিল? বৃদ্ধ আর বৃদ্ধা ঘরের জন্য অতিরিক্ত ব্যক্তি, তারা বোঝা, তারা বকবক করে, তারা বিল্ডিংটা নোংরা করে দেয়, তারা টয়লেট ব্যবহার করতে জানেন না, তারা সোফায় বসলে নোংরা হয়ে যায় সর্বোপরি তারা ঘরে থাকলে সংসারে আয় হবে না, তাদের সাথে বউ থাকতে পারবে না, বিয়ে করেছে স্বামির সাথে থাকার জন্য শ্বশুর শ্বাশুরীকে নিয়ে নয়৷ এ কথাগুলো অকপটে মুখ থেকে বের হয়ে আসে কিছু ছেলের বউয়ের ৷ স্বামির মা কিংবা বোন বাসায় থাকলে বোঝা, কিন্তু নিজের বোন কিংবা পিতা মাতা তার সাথে থাকলে তারা সহায়ক, বাচ্চা-কাচ্চা দেখাশোনা করতে পারে, বোন রান্নায় সাহায্য করতে পারে, বোন বাসায় থাকলে বোনের লেখা পড়া ভালো হবে, তখন বউয়ের খুব আনন্দবোধ হয় ৷ আর…. ননদি? ছেলেরা সবাই বিয়ে না করতেই, সংসার এক সাথে থাকতে থাকতেই  অতি মেধাবী কিশোরীকে বাল্যবিবাহ দিয়ে কন্যাদানের দায় থেকে মুক্তি পেতে চান সংসার ভেঙ্গে গিয়ে অসহায় হয়ে পড়ার আতংকিত বাবা- মা৷
আরেক অসহায় স্বামি/বৃদ্ধদের পুত্র! তিনি পিতা মাতার বেশি ভক্ত হয়ে থাকলে, তাদের বেশি ভালোবাসলে, স্ত্রীর মননশীলতা ঠিক থাকে না; শুরু হয় স্ত্রীর সাথে মনমালিন্য! অত:পর কিছু দিন যেতে না যেতেই স্বামির সাথে শুরু হয় বিচ্ছেদ, অবশেষে যৌতুক, যৌতুকের জন্য নির্যাতনের মামলা হতেও অার দেরি হয় না৷ বাংলাদেশের এ যাবত কালে যত যৌতুক ও যৌতুকের দায়ে নির্যানের মামলা হয়েছে তার সত্যতার কত শতাংশের প্রমাণ মিলেছে? স্ত্রীর কাঁন্না অনেক দূর পর্যন্ত পৌছায় স্বামির কান্না ঘর থেকে বের হয় না! বের হওয়ার কোনো পথও নাই ৷ নিরবেই সহ্য করতে হয় ৷ এদের পক্ষে কোনো আইন নাই ৷ পত্রিকায় কোনো লেখা নাই, মানববন্ধন নাই, নির্যাতনের কোনো দিবস নাই, নাই তাদের পাশে দাড়ানোর কোনো সংগঠন৷ সারাদিন রিজিকের সন্ধানে থেকে রাতে টিভিতে খবর শোনার ইচ্ছাটাও স্ত্রীর স্টার জলসায় নাটক দেখার জন্য বিসর্জন দিতে হয়৷
স্বামি প্রবাসি হলে কিংবা চাকরিজীবী হলে মেয়েরা শ্বশুর শ্বাশুরীর সাথে মোটেই থাকতে চায় না৷ বিয়ে করতে না করতে কিভাবে বাসা নিয়ে নিজ ছোট বোনকে নিয়ে অন্যত্র অালাদা সংসার করবে তা নিয়ে ব্যাকুল হয়ে পড়ে ৷ স্বামি তাতে সাঁড়া না দিলে শুরু হয় স্বামি-স্ত্রী, শ্বশুর-শ্বাশুরীর মধ্যে তুমুল বিরোধ৷ স্ত্রীর মায়ের ভাষাই থাকে, ”চাকরিজীবী জামাই দেখে মেয়ে বিয়ে দিয়েছি স্বামির সাথে বাসা করে থাকার জন্য, গ্রামে শ্বশুর শ্বাশুরীর সাথে নয় ৷” আর প্রবাসি ছেলে হলে বিয়ের পরের দিনই সে ছেলে শ্বাশুরীর ছেলেতে পরিণত হতে দেখা যায়৷ স্ত্রী ও স্ত্রীর মার ষড়যন্ত্রে টিককে না পেরে বৃদ্ধ পিতামাতা ছেড়ে আলাদা যেতে বাধ্য হয়৷ যদি স্ত্রীর কথায় মাথা নত না করে পিতা মাতার শক্তভাবে ভালোবাসায় জড়িয়ে বউ বাড়িতেই থাকতে দেয় তাহলেই শুরু হয় যৌতুক ও নির্যাতন নামক নতুন নতুন নাটক৷ পরকিয়ায় আসক্ত হয়ে সন্তানসহ স্বামি খুন করার ঘটনা নতুন কিছুই নয়৷ পত্র পত্রিকার দিকে তাকালে পরকিয়ায় আসক্ত পুরুষদের চেয়ে মহিলাদের খবরই বেশি দেখা যায়৷ মেয়েদের কান্নার যেহেতু আওয়াজ বেশি তেমনি তাদের কিছু হলেই প্রতিবেশিসহ সারা বাংলাই জানে তাদের চিৎকার আগে৷ আর পুরুষের প্রতি নারির সহিংসতার যেমন কোনো আইন নাই, দিবস নাই তেমনি বিচার দেওয়ার মতো রাস্তাও নাই৷ আপসে দীর্ঘদিন অনৈতিক কাজ করে মনমালিন্য কিংবা বোঝাপরার বিরোধ হলে ধর্ষণের মামলা পুরুষের নামেই হয় ৷ আর সেটাকে পুঁজি করেই যত গুঞ্জন জল্পনা কল্পনা আরো কত কি!
শ্বশুর শ্বাশুরী না থাকলে আগে মেয়ে বিয়ে দিতে অনেক ইতস্তবোধ করতো, আর এখন শ্বশুর শ্বাশুরী না থাকলে মেয়ে বিয়ে দেয়ার জন্য অধিক উপযোগী পাত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়৷ তাহলে বৃদ্ধ পিতা মাতা যাবে কোথায়? পাঁচ ছেলের মা-ও বৃদ্ধ বয়সে রান্না করে খেতে হয়! ছেলে চাকরিজীবী মায়েরও পেটের দায়ে রাস্তায় ভিক্ষা করা, বাবার মসজিদে সাহায্য তোলা, বাবার লাশ আঞ্জুমানে পাঠাতে বলার পিছনে অবশ্য কোনো দীর্ঘ সূত্রীতা নিহীত থাকে৷
সংসার ঠিক রাখতে হলে কিছু ছেড়েই চলতে হবে আর কিছু ছেড়ে চলতে চলতেই নিজের আলাদা একটা বাসার প্রয়োজন হয় আর মা বাবা হয়ে উঠে অসহায়৷ সেই কিছু ছেড়ে চলার রহস্যটা কী? কেন কিছু ছেড়ে চলতে হয়? কিছু ছাড়ার পরিণামটা বৃদ্ধদের জন্য কী হয়? যেহেতু সমাজ ও পরিবার থেকে নৈতিকতা ও মানবতা দিনদিন বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে সেহেতু পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইন ২০১৩ সঠিকভাবে প্রয়োগ করা উচিত এবং এ আইন সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্ট করাও জরুরী৷
পরিশেষে নারি-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই সমান আইনের সুযোগ থাকা উচিত এবং বৃদ্ধ পিতা মাতাকে ভরন পোষণ করার আইন নিশ্চিত করত: তা আরো বেগবান করতে ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা ও উপজেলা প্রশাসনকে শক্ত ভূমিকা রাখার বিধান করা সকল বৃদ্ধদের মঙ্গল কামনায় দাবী রাখছি ৷

লেখক- মো. মহসিন মিয়া
সহকারী প্রধান শিক্ষক৷