“ধাঁধার চরের রূপ অবগাহনে” মোঃ নাজমুল হাসান

প্রকাশিত: ১০:১৮ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২১

১৭ ফেব্রুয়ারি,২০২১ বিকেলে- আমরা ICTE4E অ্যাম্বসের টিম নরসিংদী ও গাজীপুর-
পৃথিবীর মানচিত্রে নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ। নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এখানকার মানুষের সভ্যতা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী বাজার, গ্রাম, গঞ্জ ও শহর।

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে প্রায় সহস্রাধিক ছোট-বড় নদ-নদী-উপনদী-শাখানদী। এগুলোর একটি হলো শীতলক্ষ্যা নদী। কথিত আছে, বাংলাদেশকে প্রায় আড়াই প্যাঁচে আবৃত করে আছে ব্রহ্মপুত্র নদ। বাংলাদেশের দীর্ঘতম এই ব্রহ্মপুত্র নদের একটি শাখা নদী হলো শীতলক্ষ্যা।
ওই

গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার সাত-আট কিলোমিটার পূর্ব দিয়ে দক্ষিণমুখী হয়ে কাপাসিয়া উপজেলা শহরের মধ্য দিয়ে কালীগঞ্জ, রূপগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদরে ধলেশ্বরী নদীতে মিলিত হয়েছে ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ শীতলক্ষ্যা। এ নদীর খ্যাতি পরিষ্কার ও স্বচ্ছ পানির জন্য। আর এ নদীর বুকেই জেগে উঠেছে নৌকা আকৃতির এক বিশাল চর। নাম তার ধাঁধার চর। আনুমানিক ২০০ বছর আগে জেগে ওঠা চরকে অনেকে বলেন মাঝের চর। কারণ চরটি লাখপুর, তারাগঞ্জ, রানীগঞ্জ ও চরসিন্দুরের মাঝখানে অবস্থিত।

আমরা ict4e জেলা শিক্ষক অ্যাম্বাসেডর টিম,নরসিংদী ও গাজীপুরের সদস্য বৃন্দ সিদ্ধান্ত নেই ধাঁধার চরের ধাঁধা লাগানো রূপ অবগাহনে। বিকাল তিনটা বাজতেই দুই জেলার অ্যাম্বাসেডর টিমের সদস্যগণ মিলিত হতে থাকে লাখপুর বাজার শীতলক্ষ্যা নদীর তীরের অভিজাত রেস্টুরেন্ট রিভারভিউতে। দুপুরের খাবার সেরে আমরা পৌঁছে গেলাম ধাঁধার চরে। কথা বললাম চরের চাষিদের সঙ্গে জানলাম শীতলক্ষ্যা নদী আর ধাঁধার চরের সমৃদ্ধ ইতিহাসের কথা।

দুই নয়ন ভরে দেখলাম ধাঁধার চরের মনলোভা সব দৃশ্য। আর শীতলক্ষ্যা নদীর বুকে জেগে উঠা এ চরটির আয়তন প্রায় আড়াইশ একর। দূর থেকে দেখলে এ চরটিকে অনেকটা সেন্ট মার্টিনসের মতো মনে হয়। আবার দেখলে মনে হয় টাইটানিক জাহাজ। ধাঁধার চরের অবস্থানটাও বেশ ধাঁধা লাগানো। চরের উত্তর-দক্ষিণে শীতলক্ষ্যা নদী, আর পূর্বে ব্রহ্মপুত্র নদ।

দুইদিকে দুই থানা কাপাসিয়া ও শিবপুর। আর আছে দুই পাশে দুই জেলা গাজীপুর ও নরসিংদী। বর্ষা মৌসুমে দুইটি নদীই থাকে গর্ভবতী, জলে টইটম্বুর। আর শীতকালে এটি হয়ে ওঠে আরও মনোরম, আরও মনোলোভা। স্থানীয় তারাগঞ্জ, লাখপুর, রানীগঞ্জ ও চরসিন্দুরের মাঝখানে এ চরকে দেখলে মনে হয় ভাসমান টাইটানিক গ্রাম।

এটি ব্রহ্মপুত্র নদ ও শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। এক সময় এই চরের নাম-নিশানা ছিল না। ছিল বহমান নদী। তারপর আস্তে আস্তে বিন্দু বিন্দু বালুকণা জমতে জমতে বেলে মাটিতে পূর্ণ হয়ে এক সময় যখন চর জেগে ওঠে, তখন স্থানীয় লোকজন এটি দেখে ধাঁধায় পড়ে যান। সেই থেকে এর নাম ধাঁধার চর।

সাবেক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী স্থানীয় একটি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক, মোঃ শামসুল হুদা লিটন স্যার আদেরকে জানান এই চরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে। জেগে ওঠা চরের মালিকানা নিয়ে ভাওয়ালের রাজা এবং বার ভূঁইয়াদের এক ভূঁইয়া মহেষ উদ্দীনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। শেষে মালিকানা পেয়ে যান ভাওয়ালের রাজা। তারপর স্থানীয় হিন্দু কৃষকরা ভাওয়ালের রাজাকে খাজনা দিয়ে চাষাবাদ শুরু করেন। চরের মাটি খুবই উর্বর। এখানে রোপণ করলে হয় না, এমন কোনো ফল-ফসল বাংলাদেশে নেই। এক সময় চরে প্রচুর আখ হতো। এখন সবচেয়ে বেশি আলুর চাষাবাদ হয়। চরের মাটির তলে বা মাটির ওপরে যা রোপণ করা হোক না কেন তা অতিফলনশীল এবং তা সারবিহীন ও সুস্বাদু।

১৯৬০, ১৯৮৮, ১৯৯৮ সালের বন্যায় চর তলিয়ে গিয়েছিল। ১৯৬০ সালের বন্যার পর চরে কোমর পর্যন্ত পানি জমে ওঠে। ফলে মাটির উর্বরাশক্তি আরও বাড়তে থাকে। সন্ধ্যাঘনিয়ে আসার আগেই চরের ডান পাশের নদীতে ও তীরে আমার দেখা মেলে নাম জানা না জানা প্রায় ১০ প্রজাতি অতিথি পাখির। এর মধ্যে শামুকখোলও ছিল। আর চরের ভিতরে গাছ-গাছালিতে বিভিন্ন ধরনের দেশি পাখি তো ছিলই। তবে ঘুঘু পাখির প্রাচুর্য চোখে পড়ার মতো। তাছাড়া চরে দেখা যায় গোসাপ ও কাঠবিড়ালী। বিকেলের আকাশে ঘুরি-ঘুরি বৃষ্টি আমাদের খানিকটা বিপাকে ফেলতে চাইলেও পরে কেটে যায়, ঝিরঝিরে বাতাসে পরিবেশটি খুব মনোরম ছিল। উড়ন্ত পাখির কলকাকলি। মাঝির আকুল করা গান।

চরের বুক দিয়ে হাঁটলে কল্পনা করা যাবে না এটি একটি চর- যার দুইপাশে রাক্ষুসে দুই নদী। মনে হবে মাসি-পিসির ঘুম পাড়ানো শান্ত-স্নিগ্ধ একটি গ্রাম। ধাঁধার চর দেখতে আসেন ভ্রমণপিপাসুরা দূর-দূরান্ত থেকে। এই চরকে যদি পর্যটন করপোরেশনের আওতায় আনা হয়, তাহলে পর্যটকরা এটি দেখে মুগ্ধ হবেন। আর সরকারের তহবিলে জমা পড়বে বিপুল অংকের রাজস্ব। সত্যিকার অর্থেই এটি দেখার মতো একটা জায়গা। এখানকার নৌকা দিয়ে চরের চারপাশ ভ্রমণ, চরে কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করে পেয়ারা বাগান, কলা বাগান, সারি সারি তাল গাছ, জাম গাছ, কুল বাগান ও নানা প্রজাতির অসংখ্য ঔষধি গাছ দেখতে পাবেন। পাশেই নদীতে থৈ থৈ জলরাশি।

ওপরে দিগন্ত বিস্তৃত খোলা আকাশ। মাছরাঙা পাখির হুটহাট জলচুম্বন, পানকৌড়ির লুকোচুরি। ভাগ্য ভালো থাকলে দেখতে দেখতে পেতাম ঘোমটকেও। টিম নরসিংদী এবং গাজীপুরের সদস্যগণ যখন চরে অবাধ বিচরণ করছেন তখন কুল বাগানের মনলোভানো কুল আমাদেকে দারুন ভাবে আকৃষ্ট করে ।

আমাদের টিম লিডার আব্দুল কাদির মৃধা স্যার যখন কুল গাছের শাখায় হাত উচিয়ে পাকা কুল ছিড়তে চাচ্ছিলেন, তখন আমাদের আব্দুল জব্বার স্যার এবং এক ম্যাম কুল বাগানিকে বেশ কিছু টাকা বিনিময় করে সবার জন্য কুলগাছের কুল ছেড়ার নিষেধাজ্ঞা উন্মুক্ত করে দেন, আর শরু হয় কুল ছেড়ার ধুম।

এরই মধ্যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, আর আমরা পরে যাই ধাধায়, নৌকার মাঝি আমাদের ধাধার চরে কোথায় নামিয়ে দিলেন, আমরাই বা আবার কোন স্থান থেকে নৌকায় চড়বো এ ব্যাপারে অনেকে ম্যানেজমেন্টকে দোষারোপ করতে থাকেন। পরিশেষে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সেই অধ্যাপক সকলকে বুঝিয়ে বলেন, এর জন্য ম্যানেজমেন্ট দায়ী নয়, আপনারা ধাধায় পরেগেছেন, এটিই এই চরের বৈশিষ্ট্য, পরে আমাদের ভুল ভাঙ্গে। আমরা দুই পাড়ে ফোন কলে যোগাযোগ করে আবার নৌকা এনে গন্তব্যে ফিরি। আশা করি প্রত্যেকের জীবনে এই দিনটি স্মৃতি হয়ে থাকবে।
লেখক
মোঃ নাজমুল হাসান
শিক্ষক নেতা, কলামিস্ট ও ICT4E জেলা শিক্ষক অ্যাম্বাসেডর নরসিংদী।