দীপাবলির তাৎপর্য।

প্রকাশিত: ৫:২৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৪, ২০২০
সৌমিত্র সাহা ,আখাউড়া উপজেলা প্রতিনিধি।
“দীপাবলি”- মঙ্গলের প্রদীপ
অন্য নাম দেওয়ালি বা দীপান্বিতা বা কালিপূজা বা আলোর উৎসব। এটি সনাতন ধর্মীয় উৎসব।
তবে বৌদ্ধ, জৈন, শিখ ধর্মালম্বীরাও এই সময়ে বিভিন্ন নামে এই উৎসব পালন করে থাকেন।
আশ্বিনমাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর দিন ধনতেরাস অথবা ধনত্রয়োদশী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দীপাবলি উৎসবের সূচনা হয়।
কার্তিকমাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে ভাইফোঁটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই উৎসব শেষ হয়।
নবরাত্রি উৎসব অথবা বাঙালিদের দুর্গোৎসব শেষ হওয়ার ১৮ দিন পর দীপাবলি শুরু হয়।
গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে, মধ্য-অক্টোবর থেকে মধ্য-নভেম্বরের মধ্যে দীপাবলি অনুষ্ঠিত হয়।
যারা দীপাবলি পালন করে:
হিন্দু, শিখ , বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের অনুসারীরা বিভিন্ন নামে এই পবিত্র উৎসব পালন করে থাকে।
ভারত, বাংলদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, মরিশাস, গুয়ানা, ত্রিনিদাদ, টোবাগো,  সুরিনাম, মালয়েশিয়া,  সিঙ্গাপুর ও ফিজিতে জাতীয় ছুটি থাকে (বাংলাদেশ ছাড়া )।
ঐ দিন বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারী ছুটি থাকে।
এই সব দেশের হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও শিখ ধর্মের মানুষেরা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে এই দিনটি উদযাপন করে।
যে আচার অনুষ্ঠান করা হয়:
রং দিয়ে বাড়ি ঘর আলপনা করে, প্রদীপ ও মোমবাতি দিয়ে বাড়ি সাজায়, আতসবাজি, মিষ্টি ও উপহার বিতরণ এবং এইদিনে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।
হিন্দুদের কাছে দীপাবলি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। বাংলদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ওড়িশা ও মিথিলাতে এই দিনটি কালীপূজা হিসেবে উদযাপন করা হয়।
হিন্দু সমাজের দৃঢ় বিশ্বাস ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন’ বা ‘ন্যায়ের কাছে অন্যায়ের পরাজয়’  বা ‘আলোর কাছে অন্ধকার পরাভূত’ এই নীতিতে ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে এই দিনটি পালিত হয়।
দীপাবলির মাধ্যমে উপনিষদের আজ্ঞায় এই কথাটা খুবই সুদৃঢ় ভাবে চরিতার্থ হয়ে ওঠে যথা: “অসতো মা সৎ গময়। তমসো মা জ্যোতির্গময়। মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়। ওঁ শান্তিঃ॥ ওঁ শান্তিঃ॥ ওঁ শান্তিঃ॥”
অর্থাৎ “অসৎ হইতে সত্যে লইয়া যাও, অন্ধকার হইতে জ্যোতিতে লইয়া যাও, মৃত্যু হইতে অমরত্বে লইয়া যাও। সর্বত্র যেন ছড়াইয়া পড়ুক শান্তির বার্তা॥”
উত্তর ভারতীয় হিন্দুদের মতে দীপাবলির দিনেই শ্রীরামচন্দ্র চৌদ্দ বছরের নির্বাসনের পর অযোধ্যা ফেরেন। নিজের পরমপ্রিয় রাজাকে ফিরে পেয়ে অযোধ্যাবাসীরা ঘিয়ের প্রদীপ জ্বেলে সাজিয়ে তোলেন তাদের রাজধানীটাকে। এই দিনটিতে পূর্বভারত বাদে সম্পূর্ণ ভারতবর্ষে লক্ষ্মী-গণেশের পুজোর নিয়ম আছে।জৈন মতে, ৫২৭ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে মহাবীর দীপাবলির দিনেই মোক্ষ বা নির্বাণলাভ করেছিলেন।
১৬১৯ খ্রিষ্টাব্দে শিখদের ষষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ ও ৫২ জন রাজপুত্র দীপাবলির দিন মুক্তি পেয়েছিলেন বলে শিখরাও এই উৎসব পালন করেন।
আর্য সমাজ এই দিনে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর মৃত্যুদিন পালন করে। তারা এই দিনটি “শারদীয়া নব-শস্যেষ্টি” হিসেবেও পালন করেন।
এছাড়া, নেপাল-ভারত-বাংলাদেশের সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেই এই উৎসব নিয়ে উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়।
“দীপাবলি” নামটির অর্থ “প্রদীপের সমষ্টি”। এই দিন হিন্দুরা ঘরে ঘরে ছোটো মাটির প্রদীপ জ্বালেন। এই প্রদীপ জ্বালানো অমঙ্গল বিতাড়নের প্রতীক।
বাড়িঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে সারা রাত প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখলে ঘরে লক্ষ্মী আসেন বলে উত্তর ভারতীয় হিন্দুরা বিশ্বাস করেন।
বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ দীপান্বিতা কালীপূজা বিশেষ জনপ্রিয়। এই উৎসব সাড়ম্বরে আলোকসজ্জা সহকারে পালিত হয়। তবে এই পূজা প্রাচীন নয়। ১৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দে কাশীনাথ রচিত শ্যামাসপর্যাবিধি গ্রন্থে এই পূজার সর্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। কথিত আছে, নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় অষ্টাদশ শতকে তার সকল প্রজাকে শাস্তির ভীতিপ্রদর্শন করে কালীপূজা করতে বাধ্য করেন।
সেই থেকে নদিয়ায় কালীপূজা বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্রও বহু অর্থব্যয় করে কালীপূজার আয়োজন করতেন।অমঙ্গল বিতাড়নের জন্য আতসবাজিও পোড়ানো হয়।বিশেষত উত্তর ভারতে দীপাবলির সময় নতুন পোশাক পড়া, পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণের প্রথাও আছে।
ধনতেরাসের দিন অনেক ভারতীয় ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের অর্থবর্ষের সূচনা হয়; লোকজন নতুন বর্তন, বাসন, গয়না প্রভৃতিও কিনে থাকেন এই দিনে। তবে বেশির ভাগ বাঙালি ব্যবসায়ীদের অর্থবর্ষের সূচনা হয় পয়লা বৈশাখে।
দ্বিতীয় দিনটিকে বলে ভূত চতুর্দশী। এই দিনে বাঙালিরা বাড়ির চোদ্দোটা এঁদো কোণায় চোদ্দোটা প্রদীপ জ্বালিয়ে কালো মুছিয়ে আলোকিত করে তোলেন বাড়িটাকে। কথায় আছে যে এমনটা করলে ভূতপ্রেত পরিবার আর স্বজনদের ঘাড়ের কাছে নড়তে পারে না।
এমনটাও লোককথায় শোনা যায় যে এই প্রদীপসজ্জার মাধ্যমে পরিবারের পিতৃপুরুষদের অনুষ্ঠানে পদার্পণ করার জন্য নিমন্ত্রণ পাঠানো হয়, যাতে তারা মায়ের বাৎসরিক আগমনে উপস্থিত হয়ে সবাইকে শুভাশীষ দিয়ে নিজেরা মায়ের আশীর্ব্বাদে মোক্ষ লাভ করবেন। তৃতীয় দিন কার্তিক অমাবস্যায় যেখানে উত্তর ভারতে লক্ষ্মী দেবীর পূজো হয়ে থাকে। একই লগ্নে বাংলদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা এবং আসামে দারুণ জাঁকজমকে চলে কালিপূজো।
কদাচিৎ কালীপুজোর দিন আর দেওয়ালির দিন পৃথকও হতে পারে। দেওয়ালির তারিখটা একদিন পরে কিংবা আগেও পড়া সম্ভব।
কেননা কালীপূজার লগ্ন অমাবস্যার মাঝরাত্রিতে ঠিক হয়, আবার দীপাবলির লক্ষ্মী পূজোর লগ্ন নিশ্চিত করা হয় অমাবস্যার সন্ধ্যেতে, তাই পুজোর লগ্ন অনুযায়ী দুই পুজোর তারিখে মাঝে মাঝে অন্তর ঘটে থাকে।
দীপাবলি বা দেওয়ালির দিনে প্রদীপের আলোয় বাড়ি-বাড়ি ঝকমক করে ওঠে। নানান রঙের বাজিতে আকাশটাও রীতিমত চকচক করে থাকে।
দীপাবলি সারি-সারি প্রদীপের আলোকে স্বর্গের দেবতাকে মর্তের কুটিরে বরণ করে নেবার উৎসব।
চতুর্থ দিন কার্তিক শুক্লা প্রতিপদ। এই দিন বৈষ্ণবেরা গোবর্ধন পূজো করেন। পঞ্চম দিন যমদ্বিতীয়া বা ভ্রাতৃদ্বিতীয়া বা ভাইফোঁটা।
এই বছরের দীপাবলি অন্যান্য বছর থেকে ভিন্ন। কেননা এবছর কভিড-১৯ মহামারীর কারণে পৃথিবী অস্থির অবস্থায় রয়েছে।কার্যত এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসের কোনো মেডিসিন বা টিকা আবিষ্কার হয়নি। চিকিৎসা বিজ্ঞানী রাত দিন আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে টিকা আবিষ্কারের জন্য।
পৃথিবীর স্বাস্থ্য কাঠামো প্রায় ভেঙ্গে গেছে। অর্থনীতির চাকা শ্লথগতিতে এগুচ্ছে। সামাজিক বন্ধনগুলো দুর্বল হয়ে আসছে।
এই মহামারী থেকে মুক্তির জন্যে চিকিৎসা বিজ্ঞানী, স্বাস্থ্যকর্মী, ব্যাংককর্মী, কৃষক, কারখানা শ্রমিক এবং পরিছন্নকর্মী সবাই পেশাদারিত্ব নিয়ে কাজ করছে।
“ভাইরাসের কালো অন্ধকারকে পরাজিত করে আবার আলোর পৃথিবী তৈরি হবে!” মর্মে এবারের দীপাবলি ‘র প্রতিটি প্রদীপ জ্বলবে!
দীপাবলির সাথে অসাধারণ পৃথিবীর এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে! এই গভীর সম্পর্ক কয়েকটি জ্বলন্ত প্রশ্নে বিদ্যমান :
>আমরা কেনো এই পৃথিবীতে?
>কেনো এই মৃত্যু? জীবন কি বা কেনো?
>ছায়াপথ বা আকাশগঙ্গা কেনো, কি আছে সেখানে?
ঈশ্বরের কাছে করোনা মোকাবেলা করার শক্তি চেয়ে আশীর্বাদ প্রার্থনা করছি দীপাবলির মাধ্যমে! সবার জীবন সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি, সুস্বাস্থ্য এবং সাফল্যের আলোয় আলোকিত হওয়ার আশীর্বাদ প্রার্থনা করছি!
সবাইকে দীপাবলির শুভেচ্ছা।
বিপ্লব চন্দ্র ঘোষ
এজিএম, বিডিবিএল, ঢাকা।