এক বার্থডে গার্লের গল্প ও কিছু স্মৃতিচারণ-   মোঃ তরিকুল আলম তারেক।

প্রকাশিত: ৭:০৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০২০

এক বার্থডে গার্লের গল্প ও কিছু স্মৃতিচারণ-   মোঃ তরিকুল আলম তারেক।

 চট্টগ্রাম ভার্সিটিতে আমার প্রথম চয়েজ ছিল একাউন্টিং কিন্তু চান্স পাই ম্যানেজমেন্টে। তাই ম্যানেজমেন্টে ভর্তি হয়ে মাস খানেক ক্লাশ করে পরে একাউন্টিং এ চলে আসি।  Farha Alam লুনা  ম্যানেজমেন্টের ছাত্রী ছিল। সে শহরে থাকত এবং সেখান থেকেই ক্যাম্পাসে আসতো । চিটাগাং যারা থাকেন তারা হয়তো মরহুম জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকুর নাম শুনে থাকবেন,উনি ছিলেন লুনার বড় বোনের হাজবেন্ড।

লুনাদের গাড়ী ছিল, সে ইচ্ছা করলে গাড়ী নিয়ে ক্যাম্পাসে আসা- যাওয়া করতে পারত। শুধু শাটল ট্রেন আর বন্ধুদের সাথে একসাথে আড্ডা দিয়ে আসার জন্য সে গাড়ী ব্যবহার করতো না। আমাদের সময় কমার্স ফ্যাকাল্টিতে মাত্র দু’টো সাবজেক্ট ছিল। ছিল অল্প কিছু ছাত্রী। বলতে গেলে রস কস বিহীন ফ্যাকাল্টি। যেখানে মেয়েদের কিচিরমিচির থাকবে না সেখানে প্রানের স্পন্দনও কম থাকবে তাইতো কেমন যেন নিস্তেজতা বিরাজ করত। আমাদের সে শূন্যতা পূরন করে কমার্স ফ্যাকাল্টিকে আলোকিত করেছিল এই মেয়েটি। সুন্দরী যাকে বলে ঠিক তাই। আর্টস আর সাইন্স ফ্যাকাল্টির হাজার মেয়ের ভীড়েও তাকে আলাদা করা যেত। লুনার সাথে আমার পরিচয় ঘটে একাউন্টিং এ আসার পর।
সুন্দরী মেয়েদের সম্বন্ধে আমার একটা ধরনা ছিল তারা অহংকারী হয়, তার মধ্যে লুনা খুব অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের মেয়ে, তাই ওর কাছ থেকে দূরে দূরে থাকতাম। কিন্তু আমার ধারনা বদলে গেল যখন তার সাথে পরিচয় হল। খুব সাদামাটা অহংকারশূন্য বন্ধু বৎসল্য একজন মানুষ। তার সহজ সরল আর সাধারন চলা ফেরা বন্ধু হিসাবে কাছে টেনে নেয়। খুব আড্ডা বাজ এবং বন্ধু প্রিয় এই বন্ধুটি ক্লাশ শেষেই চায়ের স্টলে আড্ডায় মেতে উঠতো।
                                              Farha Alam লুনা 
পুরো দোকান তখন বন্ধুরা ঘিরে থাকতো তাকে। একটার পর একটা কড়া চিনি ছাড়া লিকার চা খেয়ে যাচ্ছে আর আড্ডা দিচ্ছে বন্ধুদের সাথে। আমি প্রথম প্রথম হা হয়ে ওর চা খাওয়া দেখতাম। মেয়ে মানুষ এতো চা খায় তাও আবার কড়া লিকার দুধ চিনি ছাড়া, যা ওকে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না। চা খেতে খেতে চিটাগনিয়ান বন্ধুদের সাথে যখন আশি মেইল স্পিডে চিটাগনিয়ান কথা বলত তখন কিছুই বুঝতাম না তাদের কথা। শুনে শুধু ফেল ফেল করে তাকিয়ে থাকতাম। ভাবতাম কি মজা এই লিকার চা’য়ে! কি সুখ আছে এই ভাষায়!! লুনা যখন চোখে কালো চশমা লাগিয়ে শাটল ট্রেন থেকে নামতো তখন মনে হত প্রিন্সেস ডায়না বুঝি চবি ক্যাম্পাস পরিদর্শনে এসেছেন।
সকালের ট্রেনটা যখন আসতো তখন হলের ছেলেরা রাস্তার পাশের দোকান গুলোতে সকালের নাস্তা করতো। দোকানগুলো দখল করে রাখতো শাহজালাল হল, আমানত হল, সহওয়ার্দী হল আর কটেজের ছাত্ররা। ট্রেন থেকে নেমে শহরের ছাত্র ছাত্রীদের সেই দল বেধে যাওয়ার স্রোত দেখা যেন নাস্তার সাথে বাড়তি কিছুটা তোলা। যা ডাল ভাজির সাথে অতিরিক্ত দেওয়ার মত। কত ছেলে উৎসুক নয়নে প্রতিদিন বসে থাকতো এ দৃশ্য দেখার জন্য। আমাদের এই বন্ধুটিকে দেখার জন্যও অনেকে হয়তো উৎসুক হয়ে বসে থাকত মনে মনে।
আমরা যখন ভার্সিটিতে পড়ি তখন সবাই খুব লিমিটেড টাকায় চলতাম। বাবা- মা খুব হিসাব করে টাকা দিতেন। এখনকার ছেলে মেয়েদের মত চাইলেই টাকা পাওয়া যেত না। যদিও আমরা বই কেনা বা বিভিন্ন বানানো অজুহাতে ফাঁকি দিয়ে বারবার টাকা আনতাম বন্ধু-বান্ধবের সাথে আড্ডার টাকা যোগান দেওয়ার জন্য। আমাদের সময় মেয়েরা বোধহয় একটু কৃপন টাইপের ছিল, তাই তাদের ব্যাগে টাকা থাকলেও সেই ব্যাগের চেইন যেন খুলতেই চাইতো না। নাস্তা করতে বসলে মেয়েরা ব্যাগের চেইন খুঁলছে তা খুব কম নজরে পড়েছে।
আসলে মেয়েরা তাদের ভবিষ্যৎ সংসারকে কি ভাবে মিতব্যয়ী করতে হবে তার প্রাক্টিস সম্ভবত এখান থেকেই শুরু করত। আমি জানি আমার এ লেখা পড়ে, না জানি কত মেয়ে বন্ধু আমাকে আনফ্রেন্ড বা ব্লক করে দেবে তা উপরওয়ালাই জানেন। বন্ধুরা ভুল বুঝনা তোমাদের সাথে আড্ডা দিয়ে যে আনন্দ পেয়েছি,তা টাকার চেয়ে অনেক অনেক মূল্যবান। তোমাদের মধ্যেও অনেকেই খরচ করতো। যাক বন্ধু লুনা পারিবারিক ভাবে খুবই স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান ছিল। অনেকেই স্বচ্ছল থাকে কিন্তু সে মনের দিক থেকেও খুব স্বচ্ছল ছিল। আড্ডার পর কত বিল হল সে একবারে দিয়ে দিতো, কাউকে দিতে দিতো না। বলা যায় মহিলা হাতেম তাই।
                                              Farha Alam লুনা 
ভার্সিটি লাইফে এই বন্ধুর চা নাস্তা অনেক খেয়েছি, আমার ধারনা আমাদের সব বন্ধুরাই খেয়েছে। তার ব্যাগের সম্ভবত চেইন ছিল না, আর থাকলেও তা খোলাই থাকতো সাবসময়।
ভার্সিটি থেকে বের হওয়ার পর কয়েকবার তার সাথে ফোনে কথা হয়েছিল। তারপর টাইটানিক যেভাবে ডুবে গিয়েছিল বরফের পাহাড়ের সাথে ধাক্কা লেগে। আমার এ বন্ধুও বিনা ধাক্কায় ডুবে গিয়েছিল। দীর্ঘ বিশ বছর সেই টাইটানিক সাবমেরিনে রূপান্তরিত হয়ে পানির নীচে ঘুরে বেরিয়ে আবার ভেসে উঠেছে আগের সেই টাইটানিক হয়ে। ডুবে থাকলেও তার পারফোমেন্স কিন্তু একটুও বদলাইনি।তার স্বভাব আগের মতই আছে। বন্ধুদের আড্ডায় মাতিয়ে রাখে সেই আগের মতই। লুনা থাকা মানেই আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে জমিয়ে থাকা এক জম্পেশ আড্ডা। ধন্যবাদ বন্ধু লুনা ফিরে আসার জন্য।
বন্ধু আমার এলেবেলে লেখা দেখলেই বিরক্ত হয়। কখনও মাথার উপর দিয়ে পার করে দেয়, কখন খবরের কাগজের হেড লাইনের মত চোখ বুলিয়ে যায়। পরে আমাকে বলে তুই এতো বড় লেখা লিখিস কি ভাবে! এতো ধৈর্য কোথায় পাস! তোর লেখা দেখলে মাথা ঝিমঝিম করে। আমি জানি আমার এ লেখাটা সে পুরো পড়তে পারবে না,এতো ধৈর্য তার নেই। কড়া লিকারের দুধ চিনি ছাড়া চার কাপ চা একনাগারে খাওয়া তার কাছে এর চেয়ে অনেক আরামদায়ক । তার সেই চা’য়ের অভ্যাসটা কিন্তু এখনো বদলায়নি।
আমি জানি আমার লেখা অল্প একটু পড়ে সে চায়ের নেশায় বুদ হয়ে যাবে পুরোটা না পড়েই। তারপর কাল হয়তো ফোন করে জানতে চাইবে এই তুই কাল যে ইয়া বড় একটা লেখা লিখেছিস সেটা সংক্ষেপে আমাকে বল। এসব ফালতু লেখা পড়ার মত সময় আমার নেই। আজ সেই প্রিয় বন্ধুটির জন্মদিন। লেখাটা আগের কিন্তু এ লেখাটা আমি প্রতি বছর তাকে লিখে মনে করিয়ে দিতে চাই তুই আমাদের কতটা প্রিয় ছিলি। এখনো আছিস। এভাবেই থাকিস। ব্যাস্ততায় হয়তো সবসময় যোগাযোগ সম্ভব হয়না তবুও তুই সকলের প্রাণেই আছিস। আজ আমাদের এই প্রিয় বন্ধুটির জন্মদিন। জন্মদিনে তাকে জানাই অনেক অনেক ভালবাসা, শুভেচ্ছা শুভকামনা এবং অভিনন্দন, সেইসাথে অভিনন্দন জানাই সুখু মুতসুদ্দি, চৌধুরী রিয়াদসহ আজ যাদের শুভ জন্মদিন সকলকে ।।