আমাদের শামসুল ভাই

প্রকাশিত: ১১:০৫ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩১, ২০২০

।। আমাদের শামসুল ভাই।।

এ টি এম আশরাফুল ইসলাম সরকার রাংগা

“স্যার, জাতীয়করণের খবর কি? আপনি তো এসব নিয়ে লেখা-লেখি করেন; খোঁজ-খবরও রাখেন। আমি কি পাব স্যার! বড় আশা করে আছি। যদি আমার আমলে হত!”

সাইকেল থেকে নামা মাত্রই সালাম দিয়ে এসব কথা বলতেন উনি। এই কথাগুলো ছিল তার প্রতিদিনের মুখস্থ ডায়ালগ। মাথা নিচু করে আমি। এর কোন সদুত্তর দিতে পারিনা। শুধু বলি-

‘অপেক্ষায় থাকেন, হবে ইনশাল্লাহ্।‘

কিন্তু দু:খের বিষয় এটাই যে, তার আগেই নিজ কর্মস্থল থেকে অবসরে যেতে হল এই মানুষটিকে। আজ বিদ্যালয়ের শেষ কর্মদিবসটি শেষ করে বিদায় নিয়ে গেলেন জাহাঙ্গীরাবাদ দ্বি মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের পিয়ন, আমাদের সবার প্রিয়, সবার বন্ধু শামসুল ভাই।

শামসুল ভাই এমনি একজন মানুষ যার কথা ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা। তিনি ছিলেন সবার ভাই। আমাদের বাবার, চাচার, ফুপুর, বোনের সবার। সবাই তাকে শাসুল ভাই বলতে ডাকত। কি সততা, কি কর্তব্য, কি বিনোদন, কি ভক্তি-ই না তার ভেতরে ছিল! বিদ্যালয়ের এমন কোন সেক্টর নেই যেখানে শামসুল ভাইয়ের পদচারণা নেই।

কেউ আসুক আর না আসুক, শামসুল ভাই নিজ দায়িত্বে প্রতিটি কার্যদিবসের আধাঘণ্টা আগেই অর্থাৎ সকাল সাড়ে নয় টার মধ্যেই বিদ্যালয়ে এসে উপস্থিত হতেন। আর যেতেন সবার পরে। কোন কোনদিন রাত পর্যন্ত হয়ে যেত। তবুও কোনই অভিযোগ ছিলনা মানুষটির। অফিসের কাজে যখন যে অবস্থায় আমাদের ডাক পেতেন, তখন সে অবস্থাতেই তিনি সাড়া দিয়ে চলে আসতেন সেখানে। ঝড়, বাদল বৃষ্টি কিছুই তাকে কর্তব্য থেকে দূরে সরিয়ে দিত পারতনা। কর্মস্থলে এসেই সর্বপ্রথম খুলতেন হেডস্যারের কক্ষ। তারপর টিচার্স কমন রুম। এরপর জাতীয় পতাকার খুটিটা দাঁড় করে সুতলী দিয়ে বেঁধে রাখতেন। সবশেষে এক এক খুলে দিতেন শ্রেণি কক্ষগুলো। এরপর স্যারদের বসার চেয়ারগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে, অফিসটাকে পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখতেন।

শ্রেণি পরিচালনা করার সময় হেডস্যারের সাথে সাথে নিজেও রাউন্ড দিতেন প্রত্যেকটি ক্লাশে। কোথায় কোন বেঞ্চির অভাব, কোথায় টেবিল নেই ইত্যাদি ইত্যাদি সমস্যা সমাধানের জন্য। হুকুমের অপেক্ষায় থাকতেন কর্তৃপক্ষের। পরে কর্তৃপক্ষের নির্দেশে নিজ হাতে সব সমস্যার সমাধান করতেন তিনি।

মাঝে মাঝে বিরতির সময় অফিসে অন্যান্য স্যারদের সাথে নানা ধরনের মজার মজার সব গল্প বলে জমিয়ে রাখতেন তিনি। তার এই হাস্য-রসাত্মক গল্পগুলো শুনে মনটা চাঙ্গা হয়ে যেত। শুধু আমাদের শিক্ষকদের নয়, শিক্ষার্থীদের কাছেও তিনি বন্ধুর মত একজন প্রিয়ভাজন মানুষ উঠেছিলেন একই কারণে। কোন শিক্ষার্থীর খাতা স্ট্যাপল করতে হবে, কার ফরম পূরণ করে দিতে হবে এরকম বিভিন্ন সমস্যায় সাহায্য করতেন তিনি।

বিদ্যালয়ের নাস্তা থেকে শুরু করে যে কোন ধরনের প্রীতিভোজের দায়িত্বে ছিলেন শামসুল ভাই। অনেক সময় বিশেষ কারণে যে সব রান্না হত, এসব তিনি নিজ দায়িত্বে বাড়ি থেকেও রান্না করে আনতেন। রান্নার সমস্ত কাজে তার অংশগ্রহণ থাকা চাই-ই চাই।

এছাড়াও  বিদ্যালয়ের বিলপত্র সই, কমিটির মিটিং এর নোটিশে সদস্যদের নিকট থেকে দস্তখত নেয়া, বিল জমা প্রদান, পরীক্ষার উত্তরপত্র প্যাকেট ও সংরক্ষণ, ছিল-ছাপ্পর থেকে শুরু করে ঘণ্টা বাজনো পর্যন্ত এর সবগুলো কাজ করতেন শামসুল ভাই। আজ ভাবতেও অবাক লাগছে, এই প্রিয়ভাজন মানুষটির বিদায়ের ঘণ্টা বেজে গেছে। আমরা এমন একটি আদর্শকে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আর ধরে রাখতে পারছিনা। শামসুল ভাই গেলে হয়ত ঐ পোস্ট টির অভাব পূরণ হবে, কিন্তু শাসুল ভাইয়ের অভাব আর কোন দিন পূরণ হবে কিনা তা আমাদের জানা নেই।

শামসুল ভাই আপনি কাঁদবেন না। বিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর দোয়া, ভালোবাসা, আপনার জন্য জমিয়ে রাখা আছে। এগুলো আপনি অবশ্যই পাবেন ইনশাল্লাহ্। ‌আপনি আমাদের মাঝে ছিলেন, আছেন, থাকবেন। আমাদের বিদায়ী শ্রদ্ধা আপনি গ্রহণ করুন। আল্লাহ্ আপনাকে নেক হায়াত করুক।

লেখক: শিক্ষক, কবি, কলামিস্ট

সহকারী শিক্ষক,

জাহাঙ্গীরাবাদ দ্বি মুখী উচ্চ বিদ্যালয়

পীরগঞ্জ, রংপুর।