আজ ৩ নভেম্বর, কলঙ্কময় জেলহত্যা দিবস আজ

প্রকাশিত: ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৩, ২০২০

আজ ৩ নভেম্বর, বাংলাদেশে কলঙ্কময় জেলহত্যা দিবস আজ । পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দ্বিতীয় কলঙ্কজনক অধ্যায় রচিত হয় এই দিনে। ১৯৭৫ সালের এই দিনে একদল বিপথগামী সেনা সদস্য ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ঢুকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল জাতীয় চার নেতা বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে । এই হত্যাকাণ্ড শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, বিশ্বমানবতার ইতিহাসেও এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। কারাগারের নিরাপত্তানীতি ভেঙে রাতের অন্ধকারে এভাবে জাতীয় নেতাদের হত্যার ঘটনা বিশ্বে বিরল।

মুক্তিযুদ্ধের শত্রুরা সেদিন দেশমাতৃকার সেরা সন্তান এই জাতীয় চার নেতাকে শুধু গুলি চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, কাপুরুষের মতো গুলিবিদ্ধ দেহকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে একাত্তরের পরাজয়ের জ্বালা মিটিয়েছিল। ইতিহাসের এই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় শুধু বাংলাদেশের মানুষই নয়, স্তম্ভিত হয়েছিল সমগ্র বিশ্ব। কারাগারে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা অবস্থায় বর্বরোচিত এ ধরনের হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। জেল হত্যা দিবস উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

বিচার কার্যক্রম : জেল হত্যার পরদিন তত্কালীন উপকারা মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন) কাজী আবদুল আউয়াল লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। তবে দীর্ঘ ২১ বছর এই বিচারের প্রক্রিয়াকে ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার প্রক্রিয়া শুরু করে। মামলায় ১৯৯৮ সালের ১৫ অক্টোবর ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. মতিউর রহমান মামলার রায় দেন।জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড ছিল একই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতা। বঙ্গবন্ধুকে হতার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে ষড়যন্ত্রকারীরা জাতীয় চার নেতাকে তাদের সরকারে যোগদানের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর জাতীয় এই চার নেতা সেই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। এ কারণে তাদের নির্মমভাবে জীবন দিতে হয়। আসলে হত্যাকারীরা ও তাদের দোসররা চেয়েছিল পাকিস্তান ভাঙার প্রতিশোধ নিতে, রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ ও সীমাহীন ত্যাগের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনকারী দেশটিকে হত্যা ও ষড়যন্ত্রের আবর্তে নিক্ষেপ করতে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল পুনর্গঠন ও গণতান্ত্রিকতার পথ থেকে সদ্য স্বাধীন দেশটিকে বিচ্যুত করা এবং বাংলাদেশের মধ্যে থেকে একটি মিনি পাকিস্তান সৃষ্টি করা।

বাংলাদেশে কলঙ্কময় জেলহত্যা দিবস আজ ৩ নভেম্বর। ১৯৭৫ সালের এই দিনে একদল বিপথগামী সেনা সদস্য ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ঢুকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল জাতীয় চার নেতাকে। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলা জেলহত্যা মামলা হিসেবে পরিচিত। ওই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ১৫ জনের মধ্যে চারজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও বাকি ১১ জন এখনো অধরা। তাদের মধ্যে তিনজন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত এবং আটজন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরের মধ্যরাতে অশুভ শক্তির চক্রান্তে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারীদের অন্যতম জাতীয় চার নেতাকে,  স্বাধীন

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর মামলার প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করা হয়। ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর নিম্ন আদালত থেকে মামলার রায় পাওয়া যায়। রায়ে তিনজনের মৃত্যুদণ্ডসহ ১৫ জনের সাজা হয়। এরপর মামলা যায় হাইকোর্টে, পাওয়া যায় হাইকোর্টের রায়; যদিও সাজাপ্রাপ্তদের বেশির ভাগই পলাতক কিংবা বিদেশে অবস্থান করছে।

পলাতক আসামিদের মধ্যে দুজনের অবস্থান জানা থাকলেও বাকি ৯ জন কোথায় আছে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই সরকারের কাছে। জেলহত্যা মামলার পলাতক আসামিদের বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় সরকার তাদের ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে অনেক আগেই। এ জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করে সরকার। কিন্তু সরকারের উদ্যোগ সফলতার মুখ দেখে নি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেন, পলাতক আসামিদের ধরতে গঠিত টাস্কফোর্স কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা ও জেলহত্যা মামলার আসামিরা যেখানেই থাকুক না কেন রায় কার্যকর করতে তাদের খুঁজে নিয়ে আসব।’ তিনি আরো বলেন, ‘এ দুই মামলার আসামি একই। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় পাঁচ খুনির রায় কার্যকর করেছি। এদের মধ্যে জেলহত্যা মামলায় চারজনের দণ্ডাদেশ কার্যকর হয়েছে। তবে এখনো যাদের পাওয়া যায় নি, তাদের ধরে এনে রায় কার্যকর করবই ইনশাআল্লাহ।’

পলাতক ১১ আসামি হলেন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত এলডি (দফাদার) আবুল হাসেম মৃধা, দফাদার মারফত আলী শাহ ও রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন এবং যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত খন্দকার আবদুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এস এইচ এম বি নুর চৌধুরী, এ এম রাশেদ চৌধুরী, আহমেদ শরিফুল হোসেন, আবদুল মাজেদ, কিসমত হাসেম ও নাজমুল হোসেন। এদের মধ্যে রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে এবং নুর চৌধুরী কানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়েছিল জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ১৯৯৮ সালের ১৫ অক্টোবর ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. মতিউর রহমান রায় দেন। তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় রায়ে। সাবেক মন্ত্রী কে এম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ও তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে খালাস দেওয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি হলেন রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী শাহ ও এলডি (দফাদার) আবুল হাসেম মৃধা। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ১২ জন হলেন সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, খন্দকার আবদুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এম এইচ এম বি নূর চৌধুরী, এ এম রাশেদ চৌধুরী, আবদুল মাজেদ, আহমদ শরফুল হোসেন, মো. কিসমত হোসেন ও নাজমুল হোসেন আনসার। এদের মধ্যে সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হওয়ায় তাঁদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি।

নিম্ন আদালত থেকে পাঠানো ডেথ রেফারেন্স এবং কারাবন্দি আসামিদের করা আপিলের শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট মোসলেম উদ্দিনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় দেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি মারফত আলী ও হাশেম মৃধা এবং যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ফারুক রহমান, শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদকে খালাস দেওয়া হয়। হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর লিভ টু আপিল আবেদন করে সরকার। কিন্তু ততদিনে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় চারজনের ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় চারজনকে বাদ দিয়ে অন্যদের বিচার শুরু করেন আপিল বিভাগ। ২০১৩ সালে সরকারের আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। শুনানি শেষে ওই বছরের ৩০ এপ্রিল রায় দেন আপিল বিভাগ। রায়ে মারফত আলী শাহ ও আবুল হাসেম মৃধাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মোসলেম উদ্দিনের মৃত্যুদণ্ডও বহাল রাখা হয়। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বাকি আসামিদের সাজাও বহাল রাখা হয়।