আজ বিশ্ববরেন্য বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর ১৬৩তম জন্মবার্ষিকী

প্রকাশিত: ৮:১৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৩০, ২০২০

ভারতীয় উপমহাদেশের বিজ্ঞান চর্চার জনক আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বসু ১৮৫৮ খ্রীস্টাব্দের ৩০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ভগবান চন্দ্র বসু ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিট্রেট পদ মর্যাদার একজন অভিজাত শ্রেণীর সরকারী কর্মকর্তা। আর মাতা হলেন স্বর্ণগর্ভা সুরজ বালা বসু।
আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বসুর পূর্ব পুরুষদের আদি নিবাস ছিল বিক্রমপুরের অর্ন্তগত মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলাধীন রাঢ়ীখাল গ্রামে। সেখানে তাঁর পূর্ব পুরুষদের ৩০ একর জায়গা জমি ছিল। জগদীশ চন্দ্র বসু জীবত অবস্থায় উত্তরাধীকার সূত্রে প্রাপ্ত সকল সম্পত্তি দান করে গেছেন। তাঁর দানকৃত জায়গায় ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্যার জে সি বোস ইনস্টিটিউশন নামক মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ১৯৯৪ সালে তা স্কুল এন্ড কলেজে রূপান্তর লাভ করে। প্রতিদিন দূর দূরান্ত থেকে হাজারো মানুষ আসে বসু পরিবারের প্রত্মতাত্মিক নির্দশন দেখতে। কারন এখানে রয়েছে তাদের একটি পুরাতন দালান, যা ইতিমধ্যে সরকারের প্রত্মতাত্বিক বিভাগের আওতায় নিয়ে রক্ষনাবেক্ষন চলছে। তাছাড়া জগদীশ বসুর স্মৃতিকে সৃষ্টিশীল করতে ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে দৃষ্টি নন্দন করে গড়ে তোলা হয়েছে “স্যার জে.সি বোস কমপ্লেক্স”। কমপ্লেক্সে রয়েছে জগদীশ বসুর স্মৃতি বিজড়িত জাদুঘর, পশু পাখির ম্যুরাল ও কৃত্রিম পাহাড়-ঝর্ণা।
জগদীশ চন্দ্র বসু গ্রামের বিদ্যালয়ে লেখা পড়া শুরু করলেও ১১ বছর বয়সে চলে যান কলকাতায়। সেখানে কলকাতার বিখ্যাত স্কুল সেন্ট জেভিয়ার্সে ভর্তি হন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৮৭৯ সালে তিনি স্মাতক ডিগ্রী লাভ করেন। ১৮৮০ সালে তিনি উচ্চ শিক্ষা অর্জনে ইল্যান্ডে চলে যান। তাঁর বাবার আগ্রহে তিনি বিলেতে যেয়ে ডাক্তারী বিদ্যায় মনোনিবেশ করেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ায়, তাঁর পক্ষে ডাক্তারী বিদ্যা আয়ত্ব করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে তিনি প্রকৃতি বিজ্ঞান সম্পর্কে শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে কেমব্রিজের ক্রাইস্ট কলেজে ভর্তি হন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে অনার্স শেষ করে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এস.সি ডিগ্রী অর্জন করেন। লন্ডনে পড়াশুনা শেষ করে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন এবং পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ যোগ দেন।
বিজ্ঞানের একজন অমর প্রতিভা জগদীশ চন্দ্র বসু সর্বপ্রথম গবেষনা শুরু করেন মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি নিয়ে। এই প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়ন হলো রেডিও আবিষ্কার। এই আবিষ্কারের ফলশ্রুতিতে কোন তার ছাড়াই বার্তা পাঠানো সম্ভব। তার গবেষনার সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করেই আজকের প্রজন্ম রেডিও, টিভি ও ইন্টারনেট সেবা গ্রহণ করছে। বেতার আবিষ্কারের স্বপ্নদ্রষ্টা জগদীশ চন্দ্র বসু চেয়েছিলেন তার আবিষ্কারের মাধ্যমে ব্যবসা না করে তার আবিষ্কৃত সকল তথ্য উপাত্ত ছড়িয়ে দিতে, যাতে ভবিষ্যতে সেই বিষয় নিয়ে আরো গবেষনা করে সুফল অর্জণ করা যায়। তাই তিনি নিজের সব কর্মফলকে পৃথিবীর মানুষের কল্যানে বিনাশর্তে দান করে গেছেন। জগদীশ চন্দ্র বসুর আবিষ্কৃত সেই মৌলিক তত্ত্ব ব্যবহার করেই ইতালীর বিজ্ঞানী মার্কনী বেতার আবিষ্কারের স্বীকৃতি অর্জন করেন।
জগদীশ বসু শুধু পদার্থ বিজ্ঞানে নয়, উদ্ভিদ বিজ্ঞান ও জীব বিজ্ঞানেও তিনি মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। নতুন নতুন আবিষ্কারের নেশায় দিন রাত গবেষনায় রত ছিলেন তিনি। গাছের যে জীবন আছে এবং উদ্ভিদ ও যে আমাদের মত ঠান্ডা, গরম অনুভব করে, তার আবিষ্কৃত ক্রেসকোগ্রাফ যন্ত্রের মাধ্যমে তা সহজেই প্রমান করা যায়।
১৮৯৪ সালে তিনি বৈদ্যুতিক তরঙ্গের ওপর গবেষনার কাজ শুরু করেন। বিজ্ঞানে তার জগৎ জোড়া গবেষনা তাকে দিয়েছে এক অনন্য সম্মান। এরই ফলশ্রুতিতে ১৮৯৬ সালে লন্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টর অব সায়েন্স উপাধি লাভ করেন।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী কে? এ নিয়ে ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলা একটি শ্রোতা জরিপ এর আয়োজন করেছিল। বিবিসি বাংলার সেই জরিপের তথ্যানুযায়ী শ্রোতাদের মনোনীত শীর্ষ ২০ জন বাঙালীর মধ্যে জগদীশ বসু ৭ম স্থান লাভ করেন। এছাড়া সম্প্রতি ব্যাংক অব ইংল্যান্ড তাদের পঞ্চাশ পাউন্ডের মুদ্রায় জাগিয়ে তুলেছে বাংলার অমর বিজ্ঞানী জগদীশ বসুকে।
মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশে জগদীশ বসুর গবেষনা পৃথিবীর মানুষকে কল্যানের পথে ধাবিত করেছে। আজীবন মানব সভ্যতার উন্নয়নে নিবেদিত প্রান বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু ১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর প্রায় ৭৯ বছর বয়সে ভারতের ঝাড়খন্ডের গিরিডিতে পরলোকগমন করেন।
লেখক
প্রদীপ কুমার সাহা
সিনিয়র শিক্ষক
শ্রীনগর পাইলট স্কুল এন্ড কলেজ শ্রীনগর মুন্সিগঞ্জ।