অন্য সীমানায় অনন্ত সময়ের দিকে -শামীম তালুকদার

প্রকাশিত: ১০:৪৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২, ২০২০

হজরত শাহ জালালসহ (র.) তিনশত ষাট আউলিয়ার পূণ্য স্মৃতি বিজড়িত অগণিত সুফি-সাধক ও কৃতি পুরুষের জন্মভূমি রতœগর্ভা এই সিলেট। বাংলার অপরূপ অলংকার পূণ্যভুমি সিলেটের নাম উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে চা বাগান, মনোরম টিলা, হাওর, নদী প্রভৃতির কথা মনে পড়ে। সুরমা-কুশিয়ারা-মনু-খোয়াই বিধৌত দুটি পাতা একটি কুড়ি’র সিলেট-ঘন সবুজ সমারোহের বনরাজি ঘেরা মনোরম নি:সগের্র লীলাক্ষেত্র।
প্রায় ৫ হাজার বর্গ মাইলের ২ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত বাংলাদেশের প্রান্তি জনপদ বৃহত্তর সিলেট জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে সম্পদ মেধা ও অবদানের নিরিখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পেট্টোল, গ্যাস, পাথরসহ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর সিলেট। সবার ওপরে রয়েছে চির অভিযাত্রী দু:সাহসী মানব সম্পদ। এই সিলেটে জন্ম নিয়েছিলেন বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও আলোকিত মানবিক চিকিৎসক মঈন উদ্দিন। বহু মানবিক গুনের অধিকারী ডাক্তার মঈন স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে আছেন।

অসম্ভব মেধাবী ছিলেন ডা. মঈন উদ্দিন। বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নাদামপুর গ্রামে। তিনি নতুন বাজার বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, সিলেট এমসি কলেজ থেকে এইচএসসি ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রী অর্জন করেন। পরবর্তীতে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ছাতক হাসপাতালে যোগদান করেন। পরে প্রমোশন পেয়ে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগদান করেন। এছাড়া তিনি মেডিসিন বিষয়ে এফসিপিএস, কার্ডিওলজি বিষয়ে এমডি ডিগ্রী অর্জন করেন।

সিলেটে যোগদানের পর প্রতি শুক্রবার তাঁর গ্রামের বাড়ি নাদামপুরে এলাকার রোগীদের জন্য ফ্রি চিকিৎসা সেবা চালু করেন। ডাঃ মঈন উদ্দিনের পিতা মুনসী আহমদ উদ্দিন ছিলেন একজন পল্লী চিকিৎসক। তার একমাত্র ছেলে সন্তান ছিলেন ডা. মঈন। তিন বোন রয়েছে ডাক্তারের। তাঁর স্ত্রীও একজন ডাক্তার। ডা. মঈন উদ্দিনের দম্পত্তির দুই সন্তান। ডাক্তারি পেশায় যোগদানের পর তিনি এলাকার মানুষদের ভুলে যাননি। পল্লী চিকিৎসক পিতা মৃত্যুর আগে বলে গিয়েছিলেন এলাকার অসহায় রোগীদের যেন নিয়মিত সেবা দেন ছেলে। পল্লী চিকিৎসক বাবার কথা রেখেছেন ডা. মঈন উদ্দিন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পও করেছেন তিনি। তাছাড়া সিলেটে তিনি একটি বেসরকারি হাসপাতালে রোগী দেখতেন। সেখানেও এলাকার লোকজনকে অনেকটা ফ্রিতেই চিকিৎসা সেবা দিতেন। অত্যন্ত ধর্মভীরু মেধাবী এই চিকিৎসক তখন থেকেই সর্বমহলে ‘গরিবের ডাক্তার’ হিসেবে পরিচয় লাভ করেন।

গত ৫ এপ্রিল অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দিনের করোনা আক্রান্তের রিপোর্ট পজেটিভ আসে। এরপর থেকে তিনি নগরীর হাউজিং এস্টেট এলাকায় তাঁর বাসায় আইসোলেশনে ছিলেন। তিনিই সিলেটের প্রথম করোনায় আক্রান্ত রোগী ছিলেন। হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় গত ৭ এপ্রিল রাতে তাঁকে সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাঁর অবস্থার অবনতি হওয়ায় ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন হয়। পরে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৮ এপ্রিল বিকেল সাড়ে ৫টায় অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় পাঠানো হয়।
এমন মানবিক মানুষ মানুষের সেবা করতে গিয়েই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এই আলো হাওয়া, মেঠো পথ, রোদেলা দুপুর, ক্লান্ত বিকেল, বৃষ্টি ঝরা দিন, মায়াবী সন্ধ্যা, জ্যোৎস্না ভরা রাত- সবকিছুকে পেছনে ফেলে অবশেষে চলে গেলেন। চলে গেলেন অনন্ত সময়ের দিকে। চলে গেলেন অন্য সীমানায়। দৃষ্টির বাইরে, দূরে, বহুদূরে! গত ১৫ এপ্রিল বুধবার সকাল ৭ টায় ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গরিবের ডা. মঈন উদ্দিন।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মী।